টাইফুন বাভির তাণ্ডবে ফিলিপাইনে ৫ মৃত্যু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাঝেই এশিয়ার বুকে ধেয়ে আসছে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় ও শক্তিশালী সুপার টাইফুন ‘বাভি’ (Typhoon Bavi)। এই দানবীয় ঝড়ের পরোক্ষ প্রভাবে ফিলিপাইনে হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি ও আকস্মিক ভূমিধসে অন্তত পাঁচজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। টাইফুনটি বর্তমানে তাইওয়ান ও জাপানের দিকে ধেয়ে আসায় ওই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ রেড অ্যালার্ট।
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, টাইফুন বাভির অগ্রভাগের প্রভাবে সৃষ্ট রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ মিন্দানাওতে একাধিক স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটির নিচে চাপা পড়ে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও ছয়জন নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজদের উদ্ধারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মীরা কাজ করছেন।
তাইওয়ানের সেন্ট্রাল ওয়েদার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (CWA) জানিয়েছে, শুক্রবার টাইফুনটির কেন্দ্রের সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৯৮ কিলোমিটার। এর শক্তিশালী বাতাসের বিস্তৃতি প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। ফলে এটি গত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় টাইফুনগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।
ঝড়ের প্রভাবে আজ শুক্রবার রাজধানী তাইপেইসহ উত্তর ও পূর্ব তাইওয়ানের সমস্ত স্কুল, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শত শত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বন্দরনগরী কিলুংয়ের বাসিন্দারা দোকানে দোকানে খাবার মজুত করছেন এবং প্রচণ্ড বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে জানালার কাঁচে বিশেষ টেপ ও দোকানের সামনে বালির বস্তা দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করছেন। কিলুংয়ের রেস্তোরাঁ মালিক পেনি প্যান বলেন, “গত ১০ বছরে এমন পরিস্থিতি আমরা দেখিনি। আগে কখনও টাইফুনের জন্য আমাদের বালির বস্তা ব্যবহার করতে হয়নি।”
তাইওয়ানের আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, টাইফুন বাভির প্রভাবে পার্বত্য এলাকায় এক মিটার (১,০০০ মিলিমিটার) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা মারাত্মক বন্যা ও ভূমিধস ডেকে আনবে। ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য হুয়ালিয়েন কাউন্টি থেকে এক হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিংতে জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০ হাজারের বেশি সেনাসদস্যকে ভারী সরঞ্জামসহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জাপানের প্রত্যন্ত সাকাশিমা ও মিয়াকো দ্বীপপুঞ্জের দিকেও টাইফুন বাভি দ্রুত এগিয়ে আসায় সেখানে স্কুল-অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা ঝড়ের ক্ষতি এড়াতে সমস্ত বুকিং বাতিল করেছেন এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র জাল দিয়ে ঢেকে রাখছেন।
তাইওয়ান ও জাপানের উত্তরাঞ্চল অতিক্রম করার পর টাইফুন বাভি এই সপ্তাহের শেষভাগে সরাসরি পূর্ব চীনের উপকূলে আঘাত হানবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, চীনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে চলতি সপ্তাহের বৈরী আবহাওয়ায় বন্যা ও ঝড়ে ইতিমধ্যেই অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একটি বিশাল জলাধারের বাঁধ ভেঙে গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিস গত সপ্তাহে এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল, বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের পানি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উষ্ণ হলে ক্রান্তীয় ঝড় বা টাইফুনগুলো সমুদ্র থেকে বিপুল শক্তি ও জলীয় বাষ্প শুষে নেয়। এর ফলে বাতাসের গতিবেগ ও ভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ওপর এ বছর বিশ্বজুড়ে আবারও ফিরে এসেছে ‘এল নিনো’ (El Niño)— যা একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা এবং এটি প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়ে আবহাওয়ায় এমন প্রলয়ংকারী রূপ ধারণ করতে সাহায্য করছে।
|