স্পেনে ভয়াবহ দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে তীব্র খরা ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে পুরো ইউরোপ মহাদেশ। এরই মধ্যে স্পেনের দক্ষিণ-পূর্ব আলমেরিয়া প্রদেশের লস গালার্দোসে এক প্রলয়ংকারী ও ভয়াবহ দাবানলে (Wildfire) অন্তত ১২ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আরও অন্তত ছয়জন গুরুতর দগ্ধ ও আহত হয়েছেন। দেশটির আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক সরকার আজ এক জরুরি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও নতুন ছয়টি মরদেহ উদ্ধারের পর মৃতের সংখ্যা ১২ জনে পৌঁছানোর এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আন্দালুসিয়া আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ানমা মোরেনো এই আকস্মিক ও হাড়হিম করা মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে স্পেনের ইতিহাসের অন্যতম ‘মর্মান্তিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রাথমিকভাবে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি তাঁর অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) গভীর শোক প্রকাশ করে লেখেন, ‘এই ভয়াবহ দুর্যোগে আমাদের হৃদয় আজ চরমভাবে ভারাক্রান্ত এবং আমরা পুরো জাতি শোকে বিধ্বস্ত।’
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড বাতাসের কারণে ওপর দিয়ে যাওয়া একটি প্রধান বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে নিচে পড়ে যায়। সেই ছিঁড়ে পড়া বিদ্যুতের তারের তীব্র স্পার্ক বা স্ফুলিঙ্গ থেকেই মূলত আগুনের সূত্রপাত হয় এবং তা মুহূর্তের মধ্যে শুষ্ক হয়ে থাকা নিকটবর্তী একটি বিশাল জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্পেনের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এখনও আগুন লাগার চূড়ান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ নিশ্চিত করেনি। জরুরি বিভাগের কর্মীরা জানান, আগুন এত দ্রুত মহাসড়কে আছড়ে পড়ে যে, সাধারণ মানুষ গাড়ি নিয়ে পালানোর সুযোগও পাননি। আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বা তার চেয়েও বেশি তাপমাত্রার এক দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ (Heatwave) চলছে। এর ফলে স্পেন ছাড়াও ফ্রান্স ও পর্তুগালের বনাঞ্চলগুলোতে শত শত নতুন নতুন দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এই তিন দেশের হাজার হাজার দমকলকর্মী দিনরাত লড়াই করে যাচ্ছেন।
জরুরি পরিষেবা সূত্রে জানা গেছে, লস গালার্দোসের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রধান মহাসড়ক ও রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং আগুনের তীব্রতা দেখে আশপাশের লোকালয়ের প্রায় এক হাজার বাসিন্দাকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পেনের সামরিক জরুরি ইউনিট (UME) ইতিমধ্যেই স্থানীয় দমকল বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর কাজ করছে। এর আগে জুন মাসেই স্পেনে ১৯৫০ সালের পর সর্বোচ্চ দৈনিক গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে দেশের কিছু অংশে সর্বোচ্চ ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পারদ ওঠার পূর্বাভাস দেওয়া ছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে ইউরোপে দাবানলের ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্য ব্যবস্থা (EFFIS) জানিয়েছে, গত বছর স্পেনে রেকর্ড ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর বনভূমি ও জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের সাধারণ গড়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণেরও বেশি।
কোপারনিকাস জলবায়ু পরিষেবা (Copernicus Climate Change Service)-র বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, পুরো পৃথিবীর মধ্যে ইউরোপ মহাদেশটি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এখানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সরাসরি ফল হিসেবে গ্রীষ্মকালে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, তীব্র পানির সংকট এবং বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০০৬ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর গত বছরটি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক দাবানলের মৌসুম, যখন ইইউ জুড়ে প্রায় ১০ লাখ হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়ে যায়, যা আয়তনে ওয়েলসের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডের সমান। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপ’-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে দাবানলের মৌসুম দীর্ঘ ও তীব্র হওয়ার পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী।
|