পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের যৌথ উদ্ধার অভিযান জোরদার
জাতীয় ডেস্ক: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান নজিরবিহীন ভারী বর্ষণ, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক পাহাড়ধসের ফলে সৃষ্ট মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন, অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে সেনা সদস্যরা উদ্ধার অভিযান, জরুরি চিকিৎসাসেবা, ত্রাণ সহায়তা, উপদ্রুত অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং পাহাড়ধসে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এই মানবিক উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইএসপিআর-এর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত কয়েকদিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের ওপর পাহাড়ধস এবং তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে জেলা ও উপজেলাগুলোর অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স-এর সদস্যরা প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রকৌশল সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতি (যেমন এক্সকাভেটর, ক্রেন) নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাঁরা সড়কের ওপর ধসে পড়া টন কে টন মাটি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত অপসারণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে দিনরাত কাজ করছেন। এর পাশাপাশি, পাহাড়ের পাদদেশে ও ভূমিধসের চরম উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দুর্গম এলাকাগুলো থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২২১টি প্রান্তিক পরিবারকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে বা সেনা ক্যাম্পের আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।
টানা বৃষ্টি ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের প্রধান দুটি পর্যটন কেন্দ্র— খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি এবং বান্দরবান জেলায় কয়েক শ পর্যটক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দুর্গম এই এলাকাগুলোতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে উদ্ধারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুত ও কার্যকর সামরিক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
আইএসপিআর জানায়, এ পর্যন্ত বান্দরবানের বিভিন্ন জোনে আটকে পড়া ১৪০ জন পর্যটককে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া রাঙ্গামাটির সীমান্তঘেঁষা সাজেক ভ্যালিতে আটকে পড়া প্রায় ৬০০ জন পর্যটকের মধ্যে প্রথম ধাপে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা পেরিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ১৫০ জনকে নিরাপদ স্থানে সফলভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাজেকে চিকিৎসাধীন ও অবশিষ্ট অবরুদ্ধ পর্যটকদের পর্যায়ক্রমে এবং নিরাপদ এয়ারলিফট বা সড়ক মাধ্যমে স্থানান্তরের জোর কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।
দুর্যোগ কবলিত ও পানিবন্দি সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষুণ্নিবৃত্তি ও দুর্ভোগ লাঘবে সেনাবাহিনী উপদ্রুত বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় সশরীরে গিয়ে রান্না করা গরম খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং অন্যান্য জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধপত্র বিতরণ করছে। একই সঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারের মাঝে কোনো বৈষম্য ছাড়াই চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, আলু ও লবণসহ প্রয়োজনীয় নিত্যদিনের শুকনো খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা উপদ্রুত মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সামগ্রিক ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্ধার, ত্রাণ সহায়তা, যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং প্লাবিত এলাকার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম পুরোপুরি অব্যাহত রাখবে।
বিজ্ঞপ্তির শেষে বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা দেশের যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক বিপর্যয় ও জাতীয় সংকটে সাধারণ জনগণের জীবন, মূল্যবান সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের মানুষের স্বার্থে এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
|