অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক হাতিয়ার রিট; জানুন ৫টি প্রকারভেদ
আদালত প্রতিবেদক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার অন্যতম কার্যকর ও শক্তিশালী সাংবিধানিক হাতিয়ার হলো ‘রিট (Writ)’। রাষ্ট্র বা কোনো শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ যখন সাধারণ নাগরিকের আইনি অধিকার খর্ব করে, তখন উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র এটি। অনেক সময় হাইকোর্ট বিভাগে কোনো একজন সচেতন ব্যক্তির করা একক রিটের সুফল ভোগ করেন দেশের হাজারো বা কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রধানত পাঁচ ধরনের রিট আবেদন করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
রিট অফ হেবিয়ার করপাস (Habeas Corpus - বন্দি প্রদর্শন): কোনো ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট ও আইনগত কারণ ছাড়া বেআইনিভাবে আটকে বা গ্রেফকার করা হলে এই রিট করা যায়। এক্ষেত্রে আটকে রাখা ব্যক্তিকে অবিলম্বে আদালতে হাজির করার জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দেন।
রিট অফ ম্যান্ডামাস (Mandamus - হুকুমজারি): কোনো সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী যে দায়িত্ব পালন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা যদি তারা না করেন; তবে হাইকোর্ট আদেশের মাধ্যমে সেই কাজ করতে নির্দেশ দেন।
রিট অফ সার্টিওরারি (Certiorari - উৎপ্রেষণ): কোনো বিচারিক নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত বা এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কোনো আদেশ বা রায় দেয়, তবে হাইকোর্ট এই রিটের মাধ্যমে সেই আদেশ বাতিল করতে পারেন।
রিট অফ প্রহিবিশন (Prohibition - নিষেধাজ্ঞা): কোনো বিচারিক নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি তাদের নির্ধারিত আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো মামলার শুনানি বা কার্যক্রম শুরু করে, তবে হাইকোর্ট তাদের সেই বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করতে অগ্রিম নির্দেশ দেন।
রিট অফ কো-ওয়ারেন্টো (Quo Warranto - অধিকার পৃচ্ছা): কোনো ব্যক্তি যদি প্রয়োজনীয় আইনি যোগ্যতা ছাড়াই অন্যায়ভাবে কোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ লাভজনক পদ দখল করে থাকেন, তবে এই রিটের মাধ্যমে হাইকোর্ট ওই পদে তার বসার বৈধতা যাচাই করেন।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে ‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলাটি অত্যন্ত স্মরণীয়। এই মামলা থেকেই মূলত দেশে ‘জনস্বার্থ মামলার (Public Interest Litigation - PIL)’ শক্তিশালী আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। এই মামলার ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেন— জনস্বার্থের জন্য চরম ক্ষতিকর বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন কোনো ঘটনা ঘটলে, সেখানে সরাসরি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যে-কোনো সচেতন ব্যক্তি বা সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে জনস্বার্থে রিট মামলা করতে পারেন। সেই থেকে আমাদের দেশে জনস্বার্থে করা রিট মামলা এক ভিন্ন ও মানবিক মাত্রা পায়।
বিগত বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি কিংবা জনস্বার্থ রক্ষায় উচ্চ আদালত রিটের মাধ্যমে এমন কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন, যা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে:
১. ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন: শিশু উমাইরকে নিয়ে তার মা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট দেশের সমস্ত কর্মস্থল, বিমানবন্দর, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, শপিংমলের মতো পাবলিক প্লেস এবং স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। ২. নদীর আইনি অধিকার (জীবন্ত সত্তা): নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবি-র করা এক রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট তুরাগ নদীসহ দেশের সব নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা (Legal Entity)’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে নদী রক্ষায় প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায় এবং উচ্ছেদের নতুন আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। ৩. মায়ের পরিচয়ে ভর্তির সুযোগ: জনস্বার্থে করা এক রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরমে অভিভাবক হিসেবে শুধু মায়ের নাম দিয়েও শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ থাকতে হবে। এর ফলে পিতৃপরিচয়হীন বা বঞ্চিত শিশুরা বৈষম্য ছাড়াই শিক্ষার অধিকার পায়। ৪. ক্ষতিপূরণের অনন্য দৃষ্টান্ত: ওয়ার্কশপে কাজ করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারানো শিশু নাঈম হাসান নাহিদ ৬ বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে গত ৬ জুলাই ক্ষতিপূরণের সর্বমোট ৩০ লাখ টাকা বুঝে পায়। নাঈমের বাবার করা রিটের পর হাইকোর্টের রায় ও আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নির্দেশেই এই অর্থ মেলে। ৫. র্যাগিং মুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নবাগত শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে বাঁচাতে ‘অ্যান্টি র্যাগিং কমিটি’ গঠন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ৬. যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি: ২০০৯ সালে হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক ‘অভিযোগ কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা দীর্ঘদিন দেশের প্রধান সুরক্ষামূলক নীতিমালা হিসেবে কাজ করছে। ৭. জরুরি চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তা: সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো গুরুতর আহত ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের অস্বীকৃতি জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। সে রিটের চূড়ান্ত শুনানিতে আদালত গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অবহেলা না করে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য দেশের সব হাসপাতালকে কঠোর নির্দেশ দেন।
উচ্চ আদালতের রিট মামলার এই সামগ্রিক ও ইতিবাচক বাস্তবতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সালাউদ্দিন দোলন বাসস-কে বলেন, “রিট মামলা মূলত একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। জনস্বার্থের (রিট) মামলার মাধ্যমেই আদালতের সরাসরি হস্তক্ষেপে অনেক ক্ষেত্রে দেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সাধারণ ব্যক্তি তার আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে।”
তবে এর একটি নেতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি কিছুটা ক্ষোভের সাথে বলেন, “অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ইদানীং সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বা সস্তা বিষয় নিয়ে অনেকেই হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন শুধু শর্টকাট পন্থায় মিডিয়ায় পরিচিতি বা সস্তা পাবলিসিটি পাওয়ার জন্য। এটা খুবই অনভিপ্রেত। এই ক্ষেত্রে দেশের মূলধারার মিডিয়া ও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে জনস্বার্থহীন কোনো বিষয়কে পুঁজি করে কেউ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে না পারে। তবে সামগ্রিকভাবে আমাদের এই সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনেই জনস্বার্থ (রিট) মামলার সুরক্ষাদুয়ার সবসময় উন্মুক্ত থাকা দরকার।”
|