জুমার দিনের কল্যাণ লাভে যে ৮ আমল করবেন

প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
জুমার দিনের কল্যাণ লাভে যে ৮ আমল করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক: ইসলামী শরিয়ত ও মুসলিম উম্মাহর কাছে জুমার দিনটি (শুক্রবার) অত্যন্ত পবিত্র, বরকতময় এবং একটি ঐতিহ্যবাহী দিন। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় মহান আল্লাহ তাআলা এই দিনটিকে এক বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পবিত্র আল-কোরআনে জুমার দিন আজান হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত দুনিয়াবী ব্যস্ততা ও বেচাবিক্রি বন্ধ করে দ্রুত আল্লাহর স্মরণে মসজিদে গমনের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুরা জুমার ৯-১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিন নামাজের আজান হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচাবিক্রি বন্ধ কর, তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ। এরপর নামাজ শেষ হলে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাদিসের আলোকে জুমার দিনের সুনির্দিষ্ট ৮টি গুরুত্বপূর্ণ আমল ও এর ফজিলত নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

হাদিস শরিফে জুমার দিনের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য হলো— এক. আল্লাহ তাআলা এই দিনে মানবজাতির পিতা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. এই দিনে আদম (আ.)-কে দুনিয়ায় জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এই দিনে এমন একটি বরকতময় সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা কবুল করবেন (যতক্ষণ না সে কোনো হারাম বা পাপের কিছু প্রার্থনা করে)। পাঁচ. এই জুমার দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

জুমার নামাজ আদায় করা প্রত্যেক স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের ওপর ফরজ। হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, চুলে তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এল এবং সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে জোর করে সামনে এগিয়ে গেল না; নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল এবং ইমাম খুতবা শুরু করলে চুপ থাকল; তবে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের সমস্ত (সগিরা) গুনাহ মাফ করবেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

জুমার দিন ভালো করে গোসল করা এবং আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। হজরত আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততম সময়ে মসজিদে গেল ও ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ খুতবা শুনল, তার জন্য প্রতি কদমের (পা ফেলার) বদলে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল নামাজের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা থাকবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

জুমার দিন কে কত আগে মসজিদে প্রবেশ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে ফেরেশতারা সওয়াব লিপিবদ্ধ করেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে প্রথম ঘণ্টায় মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে দ্বিতীয় ঘণ্টায় গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। যে তৃতীয় ঘণ্টায় ঢুকল, সে যেন শিংবিশিষ্ট ছাগল কোরবানি করল। যে চতুর্থ ঘণ্টায় ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল এবং যে পঞ্চম ঘণ্টায় ঢুকল সে যেন একটি ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম যখন খুতবার জন্য মিম্বরে আসেন, তখন ফেরেশতারা তাদের খাতা বন্ধ করে খুতবা ও আল্লাহর আলোচনা শোনা শুরু করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)

জুমার দিনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এই দিনে দোয়া কবুলের একটি নিশ্চিত সময় রয়েছে। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “জুমার দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করে, তবে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এই মহিমান্বিত মুহূর্তটি তোমরা আসরের শেষ সময়ে (সূর্যাস্তের ঠিক আগে) অনুসন্ধান করো।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)

জুমার দিনের অন্যতম আমল হলো পবিত্র কোরআনের ১৮ নম্বর সুরা ‘সুরা কাহাফ’ পাঠ করা। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য নুর বা আলো হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত মুখস্থ বা পাঠ করবে, অতঃপর দাজ্জাল বের হলে সে দাজ্জালের ফিতনা দ্বারা কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।” (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩)

হাদিস শরিফে এসেছে, জুমার দিনের আদব ও নিয়ম মেনে নামাজ আদায় করলে এক সপ্তাহের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান—এর মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেয়; যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা (বড়) গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

জুমার দিনে নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ শরিফ পাঠ করা উম্মতের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনটিই সর্বোত্তম। অতএব, তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়। কারণ জুমার দিনে তোমাদের পড়া দরুদ ফেরেশতাদের মাধ্যমে সরাসরি আমার কাছে পেশ করা হয়।” সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ মৃত্যুর পর আপনার পবিত্র দেহ এক সময় মাটির সাথে মিশে নিঃশেষ হয়ে যাবে? রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ জমিনের জন্য সমস্ত নবী-রাসুলদের দেহ ভক্ষণ করা বা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

মন্তব্য করুন