দোকানে ৭ দিনে চালু হবে বাংলা কিউআর; জেনে নিন আবেদনের নিয়ম

প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
দোকানে ৭ দিনে চালু হবে বাংলা কিউআর; জেনে নিন আবেদনের নিয়ম

অর্থনীতি ডেস্ক: স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং কাগজের নোটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশে নগদবিহীন বা ‘ক্যাশলেস’ লেনদেন ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করছে সরকার। এই ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নজর কেড়েছে ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR)। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী আবেদন করলে সাধারণত মাত্র কয়েক কার্যদিবস, অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যেই দোকানে এই বাংলা কিউআর সুবিধা চালু করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় ব্যবসায়ী খুব সহজেই তাঁর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে এই বাংলা কিউআর কোড সংগ্রহ করতে পারবেন। আবেদনের সহজ ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: আবেদনকারী ব্যবসায়ীর যেকোনো একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে নিজস্ব নামে একটি সেভিংস (Savings), কারেন্ট (Current) অথবা এসএনডি (SND) অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।

  • ফরম পূরণ: ব্যক্তির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং একটি বৈধ স্থায়ী বা অস্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে, ব্যাংক থেকে নির্ধারিত ‘বাংলা কিউআর আবেদন ফরম’ সংগ্রহ করে তা পূরণ করতে হবে। এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা কর্মকর্তা বা শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে জমা দিতে হবে।

  • যাচাই ও অনুমোদন: আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শাখা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ফরমটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কার্ড বিভাগে (Card Division) পাঠাবে। সাধারণত কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই কিউআর কোড প্রস্তুত হয়ে যায় এবং তা এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদনকারী ব্যবসায়ীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।

  • প্রদর্শন: পরে ব্যাংকের শাখার সিএমএস (CMS) সফটওয়্যারে কিউআর কোডটি আপলোড হলে, ব্যবসায়ী ব্যাংক শাখা থেকে সেটি প্রিন্ট করে বা বোর্ড আকারে সংগ্রহ করে নিজের দোকানে গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করতে পারবেন।

মাসিক লেনদেনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ীদের দুইটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে। শ্রেণি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিম্নরূপ:

১. মাইক্রো মার্চেন্ট (Micro Merchant): যেসব ব্যবসায়ীর মাসিক লেনদেনের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত (যেমন: চায়ের দোকান, মুদি দোকান, হকার ইত্যাদি), তাঁদের কিউআর কোড পেতে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ফটোকপি এবং এক কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি জমা দিলেই চলবে। ২. রেগুলার মার্চেন্ট (Regular Merchant): যেসব ব্যবসায়ীর মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি, ই-টিন (e-TIN) সনদ এবং সর্বশেষ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমার স্লিপ (Tax Return Slip) বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে।

বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় এবং বৈপ্লবিক সুবিধা হলো এর আন্তঃপরিচালনযোগ্য (Interoperable) চমৎকার ব্যবস্থা। আগে একজন ব্যবসায়ীকে বিকাশ, নগদ, রকেট বা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাপের জন্য কাউন্টারে আলাদা আলাদা কিউআর কোড ঝুলিয়ে রাখতে হতো। বাংলা কিউআর আসার পর সেই ঝামেলা শেষ। এখন দোকানে মাত্র একটি সাধারণ ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্ক্যান করেই গ্রাহকরা তাঁদের যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এমএফএস (MFS) কিংবা অনুমোদিত পেমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এর ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয়ের জন্যই লেনদেন ও হিসাব সংরক্ষণ অনেক সহজ হয়ে গেছে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ফার্মেসি, রেস্তোরাঁ, সেলুন, পরিবহনসেবা এবং ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বাংলা কিউআরের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ক্যাশ টাকা বহনের পরিবর্তে সরাসরি মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ায় চুরি, ছিনতাই, জাল নোট বা টাকা হারানোর ঝুঁকি শতভাগ কমে যায়। এ ছাড়া প্রতিটি লেনদেনের নিখুঁত ডিজিটাল রেকর্ড ব্যাংকে সংরক্ষিত হওয়ায় দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা সহজ হয়, যা ভবিষ্যতে ওই ব্যবসায়ীদের ব্যাংক থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা আর্থিক ইতিহাস (Financial History) তৈরিতে বড় সহায়তা করবে।

বাংলা কিউআর ব্যবহার করার সময় ব্যবসায়ীদের আর্থিক জালিয়াতি এড়াতে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো গ্রাহক পেমেন্ট করেছেন বলে দাবি করলেই সাথে সাথে পণ্য বা সেবা দেওয়া উচিত নয়। গ্রাহকের মোবাইলে দেখানো সফল পেমেন্টের স্ক্রিনশট বা ছবি দেখে লেনদেন নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ আধুনিক যুগে ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরি করা সম্ভব।

ব্যবসায়ীর নিজস্ব মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট, মোবাইলের কনফার্মেশন এসএমএস বা ব্যাংকিং অ্যাপে টাকা সঠিকভাবে জমা হয়েছে কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল পণ্য হস্তান্তর করা উচিত। একই সঙ্গে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের ওটিপি (OTP), গোপন পিন (PIN), পাসওয়ার্ড বা অ্যাকাউন্টের সংবেদনশীল তথ্য কখনোই অন্য কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না।

মন্তব্য করুন