হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে ড্রোন ও স্নাইপার হামলার ছক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি হাই-প্রোফাইল ক্রীড়া অনুষ্ঠানে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ড্রোন এবং স্নাইপার হামলার এক নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট নস্যাৎ করেছে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। গত জুনে অনুষ্ঠিত ওই ইভেন্টে ব্যর্থ ও নৃশংস হামলার ছক আঁকার দায়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালতে আটজন উগ্র চরমপন্থীর বিরুদ্ধে হত্যা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মার্কিন ফেডারেল তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউসের লনে ‘ফ্রিডম ২৫০’ (Freedom 250) নামের একটি বিশেষ ইউএফসি (UFC) কেজ-ফাইটিং ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চরমপন্থী, উগ্রপন্থী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রান্তিক ষড়যন্ত্র তত্ত্বে (Conspiracy Theories) বিশ্বাসী এই সন্ত্রাসী চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক ড্রোন ও দূরপাল্লার স্নাইপার ব্যবহার করে সেখানে এক অভূতপূর্ব ভয়াবহতা সৃষ্টি করা।
আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, তাদের নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল—হাই-ভোল্টেজ অনুষ্ঠানটি চলাকালীন দূর থেকে বিস্ফোরক বোঝাই একটি শক্তিশালী ড্রোন উড়িয়ে এনে হোয়াইট হাউসের ভিড়ের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটানো। এরপর সেই আকস্মিক বিস্ফোরণে আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ মানুষ ও ভিআইপিরা যখন প্রাণভয়ে দিকবিদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করবে, তখন আশেপাশে লুকিয়ে থাকা স্নাইপার বা দূরপাল্লার অত্যাধুনিক রাইফেল দিয়ে সেই বিশৃঙ্খল ভিড়ের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো। এই ভয়াবহ ম্যাসাকারের মাধ্যমে মূলত বর্তমান মার্কিন সরকারকে চরমভাবে অস্থিতিশীল ও পঙ্গু করে তোলার আশা করেছিল এই উগ্রপন্থী চক্রটি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের চার্জশিট বা অভিযোগপত্র অনুসারে, এই বিপজ্জনক চক্রান্তের সূত্রপাত হয়েছিল গত মে মাসে। তখন থেকেই এই দলটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ, সামরিক গ্রেডের স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, হাজার হাজার গোলাবারুদ, বডি আর্মার, মারাত্মক আইইডি বিস্ফোরক, ড্রোন এবং যোগাযোগের অত্যন্ত উন্নত ও ট্র্যাকিং-মুক্ত সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে শুরু করে। তবে মার্কিন সরকারের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো—নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার ঠিক চার দিন আগে, অর্থাৎ গত ১০ জুন মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ফেডারেল গোয়েন্দারা (FBI) তাদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই সম্ভাব্য মারাত্মক হুমকির বিষয়টি টের পেয়ে যান।
এরপরই যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চিরুনী অভিযানে নামে মার্কিন সোয়াত ও গোয়েন্দা দল। গত মাসে ওহাইও, মিসৌরি, ওয়াশিংটন, নেব্রাস্কা এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এই চক্রের সাত সক্রিয় সদস্যকে একে একে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে ওহাইওর ১৯ বছর বয়সী কট্টরপন্থী তরুণ টাইসেন সি. প্রোপার অন্যতম, যে এই অপারেশনের লজিস্টিক সাপোর্টের দায়িত্বে ছিল। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে এই স্পর্শকাতর মামলায় অষ্টম ব্যক্তিকে অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে ঘটনার সাথে জড়িত মূল ৮ মাস্টারমাইন্ডকেই সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলো। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া ২১ বছর বয়সী এই দুধর্ষ আসামির নাম চ্যান্ডলার ডি. স্ক্যাগস, যিনি মূলত ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা।
তদন্তের গোপন নথিপত্র অনুযায়ী, এই পৈশাচিক হামলার পরিকল্পনায় ২১ বছরের তরুণ স্ক্যাগসকে একজন ‘স্নাইপার’ বা মূল লক্ষ্যভেদীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চক্রের অন্য প্রধান সদস্য প্রোপার পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের নিজেদের মধ্যকার ডিজিটাল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্ক্যাগস দমে যাননি, বরং তিনি অন্য আরেক সহ-ষড়যন্ত্রকারীর সাথে মিলে সেই ইউএফসি ইভেন্টের দিন সশরীরে হোয়াইট হাউসের আশেপাশে গিয়ে দূর থেকে ট্রাম্পের ওপর হামলা চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন।
বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে থাকা আটককৃত এই আটজন আসামির সবার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন অনুযায়ী সন্ত্রাসীদের বস্তুগত ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান, সরকারি সম্পত্তিতে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটানো এবং খোদ দেশের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে (প্রেসিডেন্ট) হত্যার ষড়যন্ত্রের মতো অত্যন্ত গুরুতর দুইটি পৃথক ফেডারেল অপরাধের চার্জ গঠন করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে মার্কিন আইন অনুযায়ী তাদের প্রত্যেকেরই সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে পারে।
|