ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সত্ত্বেও সচল হরমুজ প্রণালি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে সমস্ত আশঙ্কা ও যুদ্ধাবস্থাকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তেলের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের এই অন্যতম প্রধান লাইফলাইন দিয়ে জাহাজগুলো চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের স্বাভাবিক যাতায়াত সচল রেখেছে।
কাতার-গ্রিসের এলএনজি ট্যাঙ্কার ও জাপানি তেলের জাহাজ:
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের সর্বশেষ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন-ইরান চলমান সংঘাতের মাঝেই সম্প্রতি পাঁচটি বিশাল আকৃতির এলএনজি (LNG) ট্যাঙ্কার অত্যন্ত সফলভাবে এই হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেছে এবং নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হয়েছে। এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাঙ্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিসের পতাকাবাহী বিখ্যাত ‘গ্যাসলগ সাংহাই’ (GasLog Shanghai) এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরাশক্তি কাতারের চার দানবীয় জাহাজ— ‘আল সামরিয়া’, ‘আল দাফনা’, ‘আল গাত্তারা’ ও ‘আল রাইয়ান’।
অন্যদিকে, জাপানের পরিবহন মন্ত্রী ইয়াসুশি কানেকো (Yasushi Kaneko) টোকিওতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালির বর্তমান ও নিরাপদ পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত ৭ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে জাপানের মালিকানাধীন বা চার্টার্ড করা মোট ২২টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ অত্যন্ত নিরাপদে এই সংঘাতময় হরমুজ প্রণালি পার হয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেরিয়ে গেছে। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ২২টি জাহাজের মধ্যে ৬টি ছিল অপরিশোধিত তেল পরিবাহী বিশাল বা দানবীয় ট্যাঙ্কার (VLCC)।
নৌ-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি ছোট-বড় মালবাহী ও জ্বালানি পরিবাহী জাহাজ নিয়মিত চলাচল করত। সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা কিছুটা কমলেও, আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সাথে হওয়া বিশেষ সামুদ্রিক চুক্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫১৩টি আন্তর্জাতিক জাহাজ অত্যন্ত সফলভাবে এই প্রণালি পার হতে পেরেছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই জলপথটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ধরে রেখেছে ইরান। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই জলপথ নিয়ে তেহরান বর্তমানে চরম কড়া ও অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থাগুলোকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই প্রণালি ব্যবহারকারী সমস্ত আন্তর্জাতিক জাহাজকে অবশ্যই তেহরানের সামরিক কমান্ডের ঠিক করে দেওয়া সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নৌ-রুট বা পথেই চলাচল করতে হবে। যদি কোনো জাহাজ ইরানের নির্দেশ অমান্য করে ওমানের জলসীমার পথ বা অন্য কোনো বিকল্প রুট ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর যেকোনো সময় সামরিক হামলা হতে পারে।
এর পাশাপাশি, এই আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং এটি ব্যবহারের বিনিময়ে ইরান এখন থেকে প্রতিটি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে বিশেষ সামুদ্রিক ‘ফি’ বা ট্রানজিট কর (Tax) নেওয়ার ব্যাপারেও গুরুত্বের সাথে ভাবনা-চিন্তা করছে। যা কার্যকর হলে বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
|