মাচু পিচু যাওয়ার বিলাসবহুল ট্রেন বেলমন্ড হিরাম বিংহাম
ভ্রমণ ডেস্ক: মাচু পিচু! দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর দুর্গম আন্দিজ পর্বতমালার চূড়ায় লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ইনকা সভ্যতার এক জাদুকরী ও রহস্যময় শহর। বিশ্বের আধুনিক সপ্ত আশ্চর্যের অন্যতম এই প্রাচীন নিদর্শনটি দেখার স্বপ্ন থাকে পৃথিবীর প্রতিটি ভ্রমণপিপাসু মানুষের। তবে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে কষ্ট করে দীর্ঘ ট্র্যাকিং বা সাধারণ বাসের ক্লান্তি এড়িয়ে মাচু পিচু যাওয়ার পথটাকেই যদি রূপকথার মতো বিলাসবহুল ও আনন্দদায়ক করা যায়, তবে কেমন হয়? পর্যটকদের সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিতে পেরুর পাহাড়ি বুকে ছুটে চলে এক রাজকীয় ফাইভ-স্টার ট্রেন, যার নাম ‘বেলমন্ড হিরাম বিংহাম’ (Belmond Hiram Bingham)।
নামকরণের ইতিহাস: বিলাসবহুল এই ট্রেনটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক গল্প। ১৯১১ সালে যে বিখ্যাত মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক ও অভিযাত্রী পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই মাচু পিচুকে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে প্রথম আধুনিক বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছিলেন, সেই ‘হিরাম বিংহাম’-এর নামানুসারেই এই ট্রেনের নামকরণ করা হয়েছে। পেরুর ঐতিহাসিক কুসকো (Cusco) অঞ্চল থেকে শুরু করে মাচু পিচুর ঠিক পাদদেশে অবস্থিত শহর ‘আগুয়াস ক্যালিয়েন্টেস’ (Aguas Calientes) পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করে এই বিলাসবহুল ট্রেনটি।
পুরোনো দিনের রাজকীয় যুগ: বেলমন্ড হিরাম বিংহাম ট্রেনে পা রাখামাত্রই যেকোনো পর্যটক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। ট্রেনের ভেতর পা দিলেই মনে হবে টাইম মেশিনে চড়ে আপনি যেন ১৯২০ বা ৩০ দশকের পুরোনো কোনো রাজকীয় ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় যুগে ফিরে গেছেন। ট্রেনের ভেতরের চমৎকার ও নিখুঁত কাঠের কারুকাজ, ব্রাসের চকচকে ফিনিশিং এবং অত্যন্ত আরামদায়ক ও রাজকীয় বসার আসন পলকেই যাত্রীদের মন কেড়ে নেয়।
এই দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় একঘেয়েমি কাটানোর জন্য রয়েছে পেরুর ঐতিহ্যবাহী লাইভ মিউজিকের (Live Music) সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা। ট্রেনের পেশাদার গায়কদের সুর ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে যাত্রীরা মেতে ওঠেন অনাবিল আনন্দে। গানের সুর এতটাই মোহনীয় যে, অনেক পর্যটকই ট্রেনের বিশেষ ‘বার কার’ (Bar Car)-এ গিয়ে আনন্দে নাচতে শুরু করেন। ভ্রমণের সাথে সাথে যাত্রীদের জন্য পরিবেশন করা হয় পেরুর শেফদের তৈরি দারুণ সব স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং পেরুর বিশ্ববিখ্যাত আইকনিক পানীয় ‘পিসকো সাওয়ার’ (Pisco Sour)।
ট্রেনের সবচেয়ে বড় চমক ‘ওপেন-এয়ার কার’: তবে এই রাজকীয় ট্রেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং মূল চমক হলো এর বিশেষ ছাদখোলা ও দেয়ালখোলা বগি, যাকে বলা হয় ‘ওপেন-এয়ার কার’ (Open-Air Car)। এই বগিতে কোনো কাঁচের বা বন্ধ জানালা নেই। এখানে দাঁড়িয়ে সরাসরি পাহাড়ি খোলা বাতাস গায়ে মেখে আন্দিজ পর্বতমালার আকাশছোঁয়া চূড়া, নিচে বয়ে চলা উরুবাম্বা নদী আর চারপাশের ঘন সবুজ উপত্যকার অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করা যায়, যা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করার মতো এক অলৌকিক অনুভূতি দেয়।
প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত সুবিধা: এই রাজকীয় আয়োজনের সেবা শুধু ট্রেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ট্রেনের টিকিট বা বিশেষ প্যাকেজের আওতায় ট্রেন থেকে নামার পর আগুয়াস ক্যালিয়েন্টেস শহর থেকে বাসে করে মাচু পিচুর মূল প্রবেশদ্বারে নিয়ে যাওয়া, মাচু পিচুতে প্রবেশের মূল টিকিট এবং একজন অভিজ্ঞ গাইড সহকারে পুরো প্রাচীন ইনকা শহরটি ঘুরে দেখার দারুণ সুযোগও রয়েছে। অর্থাৎ, ট্রেনের টিকিট কাটলেই মাচু পিচু ভ্রমণের সমস্ত ঝক্কি-ঝামেলা এক নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। বিলাসবহুল ও আভিজাত্যপূর্ণ ভ্রমণের জন্য এটি বিশ্বের সেরা ট্রেন আলোগুলোর একটি।
|