যে দুই সময়ে তওবা কবুল হয় না
নিজস্ব প্রতিবেদক:মানুষ স্বভাবজাতভাবেই ভুল করে, নানা প্ররোচনায় গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, আবার পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্তও হয়। আর মানুষের এই ফিরে আসার আকুলতাকে মূল্যায়ন করতে ইসলামে ‘তওবা’র বিধান রাখা হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক মহামূল্যবান অনন্য অনুগ্রহ।
তওবার মাধ্যমে জগতের সবচেয়ে বড় পাপী মানুষটিও মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দায় পরিণত হতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বান্দার এই ফিরে আসাকে এতটাই ভালোবাসেন যে, তিনি পবিত্র কোরআনে বারবার তাকে ক্ষমার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এই ক্ষমার সুযোগ কিন্তু অনন্তকাল খোলা থাকবে না। মানুষের জীবনে এমন দুটি ভয়ঙ্কর সময় আসবে, যখন তওবা করার সমস্ত দরজা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে। তখন মানুষের শত অনুতাপ, চোখের পানি কিংবা আকুল ক্ষমা প্রার্থনা কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন:
‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)। এই অবিনশ্বর আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, বান্দা যত বড় অপরাধই করুক না কেন, আন্তরিকভাবে ফিরে এলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে এই সুযোগের দুটি অলঙ্ঘনীয় সময়সীমা রয়েছে।
প্রথম সময়: মৃত্যুর মুখোমুখি মুহূর্তে (গরগরা তথা প্রাণ কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছালে)
যখন মৃত্যুর ফেরেশতা মানুষের সামনে এসে উপস্থিত হয়ে যায় এবং পরকালের বাস্তবতা চোখের সামনে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন আর তওবা করার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। কারণ ওই মুহূর্তে ‘গায়েব’ বা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাসের যে পরীক্ষা দুনিয়াতে চলছিল, তার সময় শেষ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
‘যারা সারাজীবন পাপ করতে থাকে, অতঃপর তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে বলে, “এখন আমি তওবা করলাম”—তাদের তওবা গ্রহণ করা হবে না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সময়সীমা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার তওবা গ্রহণ করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায় (অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণা বা গরগরা শুরু হয়)।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৭)। তাই কোনো বুদ্ধিমান মুমিনের জন্য এই ভেবে গুনাহে লিপ্ত থাকা উচিত নয় যে, জীবনের শেষ বয়সে গিয়ে তওবা করে নেব। কারণ মৃত্যু কখন কার দুয়ারে কড়া নাড়বে, তা কেউ জানে না।
দ্বিতীয় সময়: কিয়ামতের দিন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হলে
কিয়ামতের মহানিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় ও চূড়ান্ত নিদর্শন হলো—সূর্য তার স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। মহাবিশ্বের এই ওলটপালটের পর মহাজাগতিক নিয়মেই আর নতুন করে কারও ইমান আনা কিংবা তওবা করা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘যেদিন তোমার প্রতিপালকের কিছু মহান নিদর্শন এসে যাবে, সেদিন এমন ব্যক্তির ইমান কোনো উপকারে আসবে না, যে আগে ইমান আনেনি বা ইমানের মাধ্যমে কোনো সৎকাজ অর্জন করেনি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫৮)
আল্লাহর রাসুল (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়। যখন তা উদিত হবে এবং পৃথিবীর সমস্ত মানুষ তা (নিজের চোখে) দেখবে, তখন সবাই একযোগে ইমান আনবে। কিন্তু তখন সেই ইমান কোনো উপকারে আসবে না, যে আগে ইমান আনেনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৬Mz; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৭)।
অন্য এক হাদিসে আল্লাহর সীমাহীন দয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ রাতে তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের পাপী তওবা করতে পারে। আবার দিনে তাঁর রহমতের হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের পাপী তওবা করতে পারে। এভাবে প্রতিদিন চলতে থাকবে, যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৫৯)।
আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন
তওবা শুধু গুনাহ বা পাপের দাগ মোচনের মাধ্যমই নয়; এটি সরাসরি আল্লাহর মহব্বত ও ভালোবাসা লাভের অন্যতম সেরা উপায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২)। আর এই জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৮)।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় 'তাওবাতুন নাসুহা' বা খাঁটি তওবা হলো এমন এক অনুশোচনা, যেখানে বান্দা প্রথমত—আন্তরিকভাবে নিজের কৃত পাপের জন্য লজ্জিত হয়, দ্বিতীয়ত—সঙ্গে সঙ্গে সেই পাপের কাজ পুরোপুরি বর্জন করে, তৃতীয়ত—ভবিষ্যতে আর কখনোই সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে এবং চতুর্থত—যদি কোনো মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করে থাকে, তবে তা দ্রুত আদায় বা ফেরত দিয়ে দেয়।
অতএব, তওবা মানুষের জীবনে এক নতুন ও পঙ্কিলতামুক্ত অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি হতাশার অন্ধকার থেকে আশার আলোতে ফেরার এক উন্মুক্ত তোরণ। কিন্তু মৃত্যুর আগমুহূর্ত এবং সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠার পর এই সুযোগ আর এক সেকেন্ডের জন্যও পাওয়া যাবে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো—আজই, এখনই সমস্ত গুনাহ থেকে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা। কারণ আগামীকাল আমাদের হায়াত থাকবে কি না, তা আমাদের জানা নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ‘তাওবাতুন নাসুহা’ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
|