আর্জেন্টিনা বনাম মিসর ম্যাচে গোল বাতিলের নেপথ্যে ফিফার নিয়ম
ক্রীড়া প্রতিবেদক: গতকাল আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল মিসরের একটি গোল বাতিল হওয়া। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মিসর দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে পাঠায় এবং খেলোয়াড়রা বুনো উল্লাসে গোল উদযাপনও শুরু করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর) বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করার পর মূল রেফারি গোলটি বাতিল ঘোষণা করেন। এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের পর থেকেই অনেক ফুটবলপ্রেমীর মনে প্রশ্ন উঠেছে, গোলটি ঠিক কী কারণে বাতিল করা হলো এবং এ বিষয়ে ফিফার অফিশিয়াল নিয়ম কী বলে।
ভিএআরের নিখুঁত ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, গোল হওয়ার ঠিক আগে একই আক্রমণের (Attacking Phase of Play) সময় মিসরের একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার একজন ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে ফাউল করেছিলেন। যদিও সেই মুহূর্তে মাঠের রেফারির চোখে বিষয়টি না পড়ায় খেলা থামানো হয়নি, তবে গোল হওয়ার পর ভিএআর পুরো আক্রমণের প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা করে। সেখানে ফাউলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রেফারি ফিফার নিয়ম অনুযায়ী মিসরের গোলটি বাতিল করেন এবং আর্জেন্টিনার পক্ষে ফ্রি-কিকের নির্দেশ দেন।
বিশ্ব ফুটবল মূলত আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) প্রণীত অফিশিয়াল ফুটবল আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করে। সেই আইন অনুযায়ী, কোনো গোল হওয়ার আগে একই বিল্ড-আপ বা আক্রমণের মধ্যে যদি আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় ফাউল, হ্যান্ডবল (হাতে বল লাগানো) বা অন্য কোনো গুরুতর নিয়মভঙ্গ করে, তাহলে ভিএআর সেই ঘটনাটি পুনরায় পর্যালোচনা করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখে। যদি পরীক্ষা শেষে নিয়মভঙ্গের বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তাহলে গোলটি বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, গোলটি মাঠের খেলায় যত সুন্দর বা জাদুকরিভাবেই হোক না কেন, নিয়ম ভঙ্গ করে করা আক্রমণ থেকে আসা গোল কখনোই বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না।
বর্তমান আধুনিক ফুটবলে ভিএআরের অন্যতম প্রধান কাজই হলো গোল হওয়ার আগে কোনো অফসাইড, ফাউল, হ্যান্ডবল বা অন্য কোনো গুরুতর নিয়মভঙ্গ হয়েছে কি না তা সুক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করা। প্রয়োজন হলে ভিএআর কক্ষ থেকে মূল রেফারিকে মাঠের পাশে থাকা স্ক্রিনে ভিডিও দেখার (On-field Review) পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর ভিডিওর প্রতিটি অ্যাঙ্গেল দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন মাঠের মূল রেফারিই।
অনেক সাধারণ সমর্থকের কাছে মাঠের এমন সিদ্ধান্ত কিছুটা কঠোর বা বিতর্কিত মনে হলেও, ফুটবলের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ সঠিক ও ন্যায্য সিদ্ধান্ত। কারণ কোনো দল যদি নিয়ম ভঙ্গ করে আক্রমণের শুরুতেই অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকে, তাহলে সেই আক্রমণ থেকে করা গোল কোনোভাবেই ফুটবল আইনের পরিপন্থী হতে পারে না। তাই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের গোল বাতিল হওয়াটি ফুটবলের বর্তমান আধুনিক নিয়মের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চলমান বিশ্বকাপ আসরে এই ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ইরান ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচেও ইরানের শেষ মুহূর্তের একটি গোল ভিডিও সহকারী রেফারির নিখুঁত সহায়তায় বাতিল করা হয়েছিল। সেই ম্যাচের রিপ্লেতে দেখা গিয়েছিল, গোল হওয়ার আগে আক্রমণকারী খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে ছিলেন এবং সেই অবৈধ অবস্থান থেকেই তিনি বলের সুবিধা পেয়েছিলেন। ফলে অফসাইডের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল করা হয়। মাঠের এই ঘটনাগুলো বারবার প্রমাণ করে যে, বর্তমান আধুনিক ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফুটবলের নিয়মাবলি আরও নির্ভুলভাবে মাঠে প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং খেলার মাঠে শতভাগ ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হচ্ছে।
|