আর্জেন্টিনাকে কি বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে সালাহর মিসর?

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ণ
আর্জেন্টিনাকে কি বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে সালাহর মিসর?

স্পোর্টস ডেস্ক: চলমান ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিসরের ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর জয়ের রেশ এখনো কাটেনি। তার আগেই গোটা ফুটবল বিশ্বের চোখ আটকে গেছে আজ মঙ্গলবারের (৭ জুলাই) এক মহাকাব্যিক মহারণে। নকআউট পর্বের চরম স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে নিজের নেওয়া শেষ পেনাল্টি থেকে নিখুঁত গোল করে দলকে জেতানোর পর, সাবেক লিভারপুল মহাতারকা মোহামেদ সালাহর বাঁধভাঙা উল্লাস ছিল দেখার মতো। অতীতে দুটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পেনাল্টি মিস করার তিক্ত স্মৃতি থাকা সালাহ ডালাসের সেই রূপকথার জয়কে তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিজের ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে সালাহ মুচকি হেসে তীব্র আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। অবশেষে সেই স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে আজ রাতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় এই প্রথমবার একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নামছেন আধুনিক ফুটবলের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি।

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আজ রাতের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি আন্তর্জাতিক জার্সিতে তাঁদের প্রথম দেখা হলেও, ক্লাব ফুটবলের মঞ্চে এর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরা। যার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল ২০১৯ সালের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল। কাম্প ন্যু-তে প্রথম লেগের ম্যাচে মেসির বার্সেলোনা ৩-০ ব্যবধানে লিভারপুলকে হারিয়ে দিলেও, ফিরতি লেগে অ্যানফিল্ডে অবিশ্বাস্য এক রূপকথা লিখেছিল অলরেডরা। যদিও ইনজুরির কারণে ৪-০ ব্যবধানের সেই বিখ্যাত মহাকাব্যিক জয়ের ম্যাচে সালাহ মাঠে নামতে পারেননি, তবে গ্যালারিতে তাঁর পরিহিত 'নেভার গিভ আপ' (কখনও হার মেনো না) লেখা টি-শার্টটি পুরো দলকে অলৌকিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

লিওনেল স্কালোনির বিশ্বজয়ী ও তারকাবহুল আর্জেন্টিনাকে রুখতে হলে আজ রাতে মিসরের ঠিক সেই ধরনের আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাসেরই প্রয়োজন। তবে মিসরের জাতীয় দলের পরিচালক ইব্রাহিম হাসান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা মাঠে শুধু মেসিকে নিয়ে আলাদা কোনো ছক কষছেন না। লিভারপুলের জার্সি গায়ে ২৫৭টি গোল করা কিংবদন্তি সালাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন— প্রতিপক্ষের দলে যদি ১ জন মেসি থাকে, তবে তাদের দলে আছেন মোহাম্মদ সালাহ এবং মাঠের বাকি ২৬ জন ফুটবলারও একেকজন মেসির মতোই মরণপণ লড়াই করবেন।

অবশ্য গ্রুপ পর্বে ইরানের বিপক্ষে খেলার সময় হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ার পর তড়িঘড়ি করে মাঠে ফেরা সালাহর শারীরিক ফিটনেস নিয়ে ফুটবল মহলে কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে রবিবার সকালে আটলান্টার রাজপথে সতীর্থদের সাথে তাঁকে বেশ ফুরফুরে ও ফুর্তিবাজ মেজাজেই দেখা গেছে। অন্যদিকে, শেষ বত্রিশের ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে অত্যন্ত কঠিন ও ঘর্মাক্ত লড়াইয়ের পর আর্জেন্টিনা দলও আটলান্টায় এসে পৌঁছেছে। আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড সার্জিও অ্যাগুয়েরো এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘ ভ্রমণ এবং ব্যাক-টু-ব্যাক ম্যাচ খেলা নিয়ে আলবিসেলেস্তেদের ক্লান্তি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কুশলী অ্যাগুয়েরো মনে করেন, কেপ ভার্দের চেয়ে মিসর দল শারীরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আগ্রাসী এবং আক্রমণে তাদের ফুটবলারদের মান অনেক উন্নত, যা আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ কিন্তু কিছুটা ধীরগতির রক্ষণভাগের জন্য আজ এক মস্ত বড় পরীক্ষা হতে পারে। বিশেষ করে মিসরের তরুণ তুর্কি হামজা আবদেলকরিমকে সালাহর যোগ্য উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে, যিনি মাঠ ও মাঠের বাইরে সালাহর কাছ থেকেই প্রতিনিয়ত দীক্ষা ও অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।

এদিকে ম্যাচ শুরুর আগেই মিসরের ফুটবল ভক্তদের জন্য এসেছে আরেকটি বড় ও স্বস্তির খবর। ঘোষণা করা হয়েছে যে, আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মোহামেদ সালাহ জাতীয় দলের অফিশিয়াল অধিনায়ক হিসেবে থাকছেন এবং হোসাম হাসানই প্রধান কোচের দায়িত্বে বহাল থাকছেন। গত ১ জুলাই লিভারপুলের সাথে দীর্ঘ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩৪ বছর বয়সী এই সালাহর পরবর্তী ক্লাব ফুটবল গন্তব্য এখনো চূড়ান্ত না হলেও, সৌদি প্রো লিগ বা ইউরোপের কোনো শীর্ষ ক্লাবে তাঁর যাওয়ার জোর গুঞ্জন রয়েছে।

চলতি বিশ্বকাপে ইনজুরি আর ক্লাবের চড়াই-উতরাইয়ের মাঝেও সালাহ এখন পর্যন্ত আসরের সবচেয়ে বেশি ১৬টি নিশ্চিত গোল করার সুযোগ (Chance Creation) তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। নিয়মিত যোগব্যায়াম, জিম ও কঠোর লাইফস্টাইল মেনে চলা সালাহ ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির মতোই আরও দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে নিজের ম্যানেজারের করা জাতীয় দলের সর্বোচ্চ ৬৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতে সালাহর আর মাত্র একটি আন্তর্জাতিক গোল প্রয়োজন। আজকের এই বিগ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর আত্মবিশ্বাসে ফুটতে থাকা এবং হারানোর কিছু না থাকা মিসর এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে এক এভারেস্টসম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সালাহর ফারাও বাহিনী কি পারবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্তব্ধ করতে, নাকি মেসির জাদুতে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখবে—তার উত্তর মিলবে আজ মাঠের লড়াইয়ে।

মন্তব্য করুন