‘আয়নাবাজি’, ‘তুফান’ থেকে ‘বনলতা সেন’: সংখ্যার চেয়ে মানে বিশ্বাসী নাবিলা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯ অপরাহ্ণ
‘আয়নাবাজি’, ‘তুফান’ থেকে ‘বনলতা সেন’: সংখ্যার চেয়ে মানে বিশ্বাসী নাবিলা

বিনোদন প্রতিবেদক: একটা সময় দেশের সিনেমা অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকদের কাছেও তিনি পরিচিত ছিলেন কেবল ‘আয়নাবাজির নাবিলা’ নামে। সেই ব্লকবাস্টার ছবির পর দীর্ঘ এক বিরতি। শোবিজের অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো রুপালি পর্দায় আর কখনই দেখা যাবে না তাঁকে। কিন্তু সব জল্পনা উড়িয়ে তিনি ফিরলেন এমন এক সিনেমা দিয়ে, যা দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও সফল বাণিজ্যিক ছবিতে পরিণত হলো। সেটি শাকিব খানের ‘তুফান’। আর বর্তমানে তিনি প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মুগ্ধ করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের ও মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’ দিয়ে।

এই তিনটি সিনেমাই যেন মাসুমা রহমান নাবিলার অভিনয়জীবনের তিনটি আলাদা মাইলফলক বা অধ্যায়। ফলে তিনটি ভিন্ন সময়ের ভিন্ন চরিত্র এবং ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্প জমা হয়েছে তাঁর ঝুলিতে। মজার ব্যাপার হলো, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নাবিলার চলচ্চিত্রের সংখ্যা আঙুলে গোনা। অথচ সেই অল্প কাজই তাঁকে এনে দিয়েছে স্থায়ী ও কালজয়ী পরিচিতি। সংখ্যার চেয়ে কাজের গুণগত মানের ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখা এই অভিনেত্রী এখন মনে করেন, তাঁর ভাগ্যটাই হয়তো এমন সুনির্দিষ্ট ছিল।

সম্প্রতি এক একান্ত আলাপচারিতায় নাবিলা বলেন, এখন ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর মনে হয়, কম কাজ করলেও তিনি একজন ভীষণ ভাগ্যবান অভিনেত্রী। কারণ তাঁর করা তিনটি সিনেমার কোনোটিই এমন হয়নি যে মুক্তি পেয়েই পর্দা থেকে হারিয়ে গেছে; বরং প্রতিটি সিনেমাই দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলা সিনেমার উল্লেখযোগ্য ও মানসম্পন্ন কাজের তালিকা যখনই তৈরি হবে, সেখানে ‘আয়নাবাজি’, ‘তুফান’ ও ‘বনলতা সেন’-এর নাম সম্মানীর সাথে উচ্চারিত হবে। একজন ডেডিকেটেড অভিনয়শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

তবে এই সুখ্যাতির পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। ক্যারিয়ারের নানা মোড়ে তাঁর মনের ভেতরও দানা বেঁধেছিল তীব্র হতাশা। অতীতে অনেক সিনেমা হাতছাড়া হয়েছে, যেগুলোতে কাজ করার সুযোগ পেলে হয়তো আজ তাঁর ছবির তালিকাটা আরও দীর্ঘ হতো। অন্যের অভিনীত কিছু চমৎকার সিনেমা দেখেও নস্টালজিক নাবিলা ভেবেছেন, এই দুর্দান্ত গল্পের অংশ যদি তিনি নিজে হতে পারতেন! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আক্ষেপকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে বাস্তবমুখী জীবনবোধ। এখন তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক শিল্পীর জন্য মহাবিশ্বে নির্দিষ্ট কিছু কাজই অপেক্ষা করে। যেটুকু আসলে ভাগ্যে লেখা থাকে, সেটুকুই শেষ পর্যন্ত নিজের হয়ে ধরা দেয়।

শোবিজে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে— ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’ (চোখের আড়ালে গেলেই মনের আড়ালে চলে যাওয়া)। দীর্ঘ বিরতির কারণে মানুষ তাঁকে ভুলে যেতে বসেছে কি না, এমন একটা আশঙ্কা একসময় নাবিলাকেও তাড়া করেছিল। কিন্তু ‘তুফান’ এবং এখনকার ‘বনলতা সেন’ যেন সেই ভয়কে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে। নতুন কাজ ও ভিন্নধর্মী চরিত্র দিয়েই আবার দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছেন তিনি। তাই এখন আর কেরিয়ার নিয়ে অতিরিক্ত কোনো প্রত্যাশা করেন না। কারণ তাঁর ভাষায়, ‘বেশি প্রত্যাশা থেকেই আসলে মানুষের মনে বেশি হতাশার জন্ম হয়।’

গেল ঈদুল আজহায় নাবিলা প্রেক্ষাগৃহে এসেছিলেন ‘বনলতা সেন’ নিয়ে। পুরোদস্তুর ধুমধাড়াক্কা কমার্শিয়াল সিনেমা ‘তুফান’-এর পর এমন শৈল্পিক ঘরানার সিনেমা নিয়ে আসাটা দর্শকদের জন্য ছিল এক বড় চমক। ছবিতে একসঙ্গে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রকে পর্দায় ধারণ করতে হয়েছে তাঁকে। এমন চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিপ্ট ও রিহার্সাল নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে পুরো টিম। প্রতিটি দৃশ্যের মহড়া হয়েছে প্রপস, কস্টিউম ও পূর্ণ পরিকল্পনা মেনে। দিনের পর দিন সংলাপ আওড়াতে আওড়াতে ধীরে ধীরে চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বের গভীরে ঢুকে গিয়েছিলেন তাঁরা।

নাবিলার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ছবির পরিচালক উজ্জ্বল খুবই পারফেকশনিস্ট একজন মানুষ। শুটিং ফ্লোরে যাওয়ার আগে তিনি কোনো ধরনের দ্বিধা বা অপ্রস্তুতি রাখতে চান না। সেই কারণেই শুটিংয়ের আগে মহড়ার ওপর এত জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তুতি এতটাই নিখুঁত ছিল যে, মূল শুটিংয়ে কোনো ‘এনজি’ (No Good) শটের প্রয়োজনই পড়েনি। একজন পেশাদার অভিনেত্রীর জন্য এমন অভিজ্ঞতা যেমন বিরল, তেমনি ভীষণ স্বস্তিদায়কও।

অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থাপনা নাবিলার আরেকটি শক্তিশালী ও প্রশংসিত পরিচয়। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলেও এখানেও তিনি বরাবরই সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, এমন অনুষ্ঠানই করা উচিত, যেটি নিয়ে আমজনতার মধ্যে সুস্থ আলোচনা তৈরি হয় এবং যা দীর্ঘদিন মানুষের মনে দাগ কেটে থাকে। কোনো ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কিছু বাণিজ্যিক কাজ করতে হলেও, বাকি অনুষ্ঠান বা শো নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি এখনও খুব সচেতন। ফলে অন্য অনেক সমসাময়িক উপস্থাপকের তুলনায় তাঁর কাজের সংখ্যা কম হলেও মানের দিক থেকে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পেরেছেন।

বর্তমান সময়ের সস্তা ‘কনটেন্ট সংস্কৃতি’ ও পডকাস্ট নিয়ে নিজের অবজারভেশন ও ক্ষোভও খোলেমেলা প্রকাশ করেছেন নাবিলা। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল ‘ভাইরাল’ হওয়ার নোংরা প্রতিযোগিতায় অনেক নামী অনুষ্ঠানই তাদের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিনেমা মুক্তির সময় শিল্পীদের বাধ্য হয়ে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিতে হয়, যেখানে অধিকাংশ জায়গায় একই গৎবাঁধা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটে। একই উত্তর বারবার দিতে দিতে শিল্পীদের কাছেও বিষয়টি চরম একঘেয়ে হয়ে ওঠে।

আরও একটি বিষয় তাঁকে ভীষণ ভাবায়। এখনকার অনেক উপস্থাপকই স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে অতিথিকে বোঝার চেষ্টা করেন না। ফলে অতিথির ভেতরের আসল ব্যক্তিত্ব, গভীর অভিজ্ঞতা বা নতুন কোনো দিক সাধারণ মানুষের সামনে উঠে আসে না। অথচ একটু পড়াশোনা ও প্রস্তুতি নিলেই একজন মানুষকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব। নাবিলা মনে করেন, একজন ভালো উপস্থাপকের কাজ শুধু তোতাপাখির মতো প্রশ্ন করা নয়; বরং অতিথির ভেতরের অজানা গল্পগুলো আস্থার সাথে দর্শকের সামনে তুলে আনা।

ভাইরাল সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তাঁর চাবুক মন্তব্য আরও স্পষ্ট। এখনকার অনেক অনলাইন শো বা পডকাস্টেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু আপত্তিকর ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন রাখা হয়, যা অতিথিকে সরাসরি বিব্রত করতে পারে। সুস্থ আলোচনার চেয়ে বিতর্ক তৈরি করাই যেন বর্তমান মিডিয়ার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানসম্মত আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক প্রশ্ন কিংবা একজন গুণী শিল্পীকে মর্যাদার সাথে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা খুব কমই দেখা যায়। নাবিলার মতে, ইদানীং ইউটিউব বা পডকাস্টের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে যত বেড়েছে, সেই অনুপাতে মানসম্পন্ন ও রুচিশীল অনুষ্ঠানের সংখ্যা মোটেও বাড়েনি।

নাবিলার পুরো ক্যারিয়ারের গ্রাফের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি কখনোই নিজেকে অন্ধ কাজের সংখ্যার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে সস্তা করেননি; বরং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন এমন সব জুতসই চরিত্রের জন্য, যা তাঁকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে আবিষ্কার করবে। হয়তো সে কারণেই ‘আয়নাবাজি’র মায়াবী হৃদি, ‘তুফান’-এর গ্ল্যামারাস চমক কিংবা ‘বনলতা সেন’-এর বহুমাত্রিক লুকে—প্রতিটি কাজই তাঁর অভিনয়জীবনে আলাদা ও উজ্জ্বল সিগনেচার তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন অনেক চেনা মুখ আছেন, যাদের ঝুলিতে শত শত সিনেমার তালিকা। কিন্তু খুব কম ভাগ্যবানের পক্ষেই বুক ফুলিয়ে বলা সম্ভব যে, তাঁদের করা প্রায় প্রতিটি কাজই দর্শকের স্মৃতিতে চিরসবুজ রয়ে গেছে। নাবিলা ঢালিউডের সেই ব্যতিক্রমী ও রুচিশীল দলের একজন প্রথম সারির প্রতিনিধি। সময়ের ব্যবধানে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি সিনেমাই তাঁর দীর্ঘ পরিচয়ের এক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

সম্ভবত এ কারণেই এখন আর নতুন কাজের সংখ্যা বা প্রতিযোগিতার দৌড় নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নন। নাবিলা মনে করেন, একজন খাঁটি শিল্পীর সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপা হয় না তিনি কতগুলো সিনেমা দিয়ে হল ভরিয়েছেন তা দিয়ে; বরং তাঁর ফুটিয়ে তোলা কতগুলো চরিত্র দর্শকের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে, তা দিয়েই। আর সেই মহৎ হিসাব কষলে, মাসুমা রহমান নাবিলার ঢালিউড পথচলা নিঃসন্দেহে অন্য সবার চেয়ে অনেকটাই আলাদা—ধীর, সংযত, কিন্তু রাজকীয় ও স্মরণীয়।

মন্তব্য করুন