বিবাদ ভুলে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির প্রশংসায় ট্রাম্প

প্রকাশ: বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ
বিবাদ ভুলে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির প্রশংসায় ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আন্তর্জাতিক রাজনীতির আঙিনায় একের পর এক নাটকীয় মোড় নিতে ওস্তাদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাথে সাম্প্রতিক সময়ের সমস্ত ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক তিক্ততা এবং তীব্র বাকযুদ্ধ ভুলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন তিনি। ন্যাটোর (NATO) হাইপ্রোফাইল শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বর্তমানে তুরস্কে অবস্থান করছেন ট্রাম্প। আর সেখানেই মেলোনির কড়া সমালোচনা করা বন্ধ করে তাঁর প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

গতকাল মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর সম্মেলনের ফাঁকে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “বিগত দিনগুলোতে আমাদের মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেলেও, আমি মনে করি আসলে তিনি একজন ভীষণ ভালো মানুষ।” অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেও এই মেলোনির সাথেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজিরবিহীন কথার লড়াই ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছিল।

কূটনৈতিক এই বিবাদের শুরু হয়েছিল গত জুনের শেষের দিকে। ট্রাম্প ইতালির একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বিস্ফোরক দাবি করেন যে, জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তাঁর সাথে একটি অফিশিয়াল ছবি তোলার জন্য রীতিমতো ‘ভিক্ষা’ করেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, তিনি কেবল দয়া ও সৌজন্যতা দেখিয়েই মেলোনির সাথে ছবি তুলতে রাজি হয়েছিলেন। ট্রাম্পের এমন আপত্তিকর মন্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে মেলোনি তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ট্রাম্পও দমবার পাত্র ছিলেন না, তিনি নিজের দাবিতে অনড় থাকেন। ইউরোপের এই কট্টর ডানপন্থী নেত্রীর সাথে ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এত উগ্র রূপ নেয় যে, গত রোববার ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মেলোনির একটি বিকৃত বা ‘ভুয়া ছবি’ পোস্ট করে তাঁকে প্রকাশ্যে মারাত্মক কটাক্ষ করেছিলেন।

ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বাইরে এই দুই নেতার মূল মতবিরোধের ক্ষেত্র ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। ইতালিও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, “হ্যাঁ, আমাদের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা খারাপ হয়েছিল। কারণ তিনি (মেলোনি) হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে আমাদের সামরিকভাবে সাহায্য করতে রাজি হননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পছন্দ করি, কিন্তু আমি মনে করি ইরান ইস্যুতে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সংকটে আমাদের পাশে ছিলেন না, আর এতে আমি মোটেও খুশি ছিলাম না।”

উল্লেখ্য, ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জিডিপির নির্দিষ্ট অংশ সামরিক খাতে খরচ না করায় আগে থেকেই তীব্র ক্ষুব্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ট্রাম্পের কারণে ন্যাটোর ভবিষ্যৎই হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। বর্তমানে ট্রাম্পকে শান্ত রাখতে এবং মার্কিন সমর্থন ধরে রাখতে ন্যাটোর অন্য মিত্র দেশগুলো তড়িঘড়ি করে নিজেদের সামরিক বাজেট ও প্রতিরক্ষামূলক খরচ বাড়িয়ে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। আর তারই ধারাবাহিকতায় মেলোনির সাথে ট্রাম্পের এই সুর নরম করাকে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন