তুরস্কের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে এফ-৩৫ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; ট্রাম্পের ঘোষণা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হওয়া হাইপ্রোফাইল ন্যাটো (NATO) শীর্ষ সম্মেলনের শুরুতেই এক বিরাট কূটনৈতিক ও সামরিক চমক দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে ঝুলে থাকা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই তুরস্কের ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাচ্ছে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ (F-35 Joint Strike Fighter) আঙ্কারার কাছে পুনরায় বিক্রি করার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আঙ্কারার ঐতিহ্যবাহী বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকের শুরুতেই গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, “আমরা তুরস্কের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো পুরোপুরি তুলে নিতে যাচ্ছি। খুব সহজ হিসাব, আমরা আমাদের বন্ধুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখতে চাই না। এখন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উপযুক্ত সময়।”
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কঠোর আইন ‘কাটসা’ (CAATSA)-এর অধীনে ২০২০ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। মূলত ২০১৯ সালে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক যখন রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল অর্থ খরচ করে ‘এস-৪০০’ (S-400) আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনেছিল, তখন ওয়াশিংটন তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে এই পদক্ষেপ নেয়। শুধু তাই নয়, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরির বহুজাতিক কনসোর্টিয়াম ও প্রকল্প থেকেও আঙ্কারাকে একতরফাভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সে সময় তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায়, একপেশে এবং বেআইনি’ বলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
নিষেধাজ্ঞা ও এফ-৩৫ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “এফ-৩৫ একটি দারুণ প্লেন, বর্তমান বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিমান। আমরা এটি তুরস্ককে দেওয়ার বিষয়ে খুব দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি।” ইউরোপের অন্যান্য ন্যাটো মিত্রদের সাথে যখন ইরানের যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের তীব্র বাদানুবাদ চলছে, তখন এরদোয়ানের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, “তুরস্কের সাথে বর্তমানে আমাদের সম্পর্ক সম্ভবত ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে তুরস্ক আমাদের প্রতি অনেক বেশি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা দেখিয়েছে।”
ট্রাম্পের এই ইতিবাচক মন্তব্যের পর ইতালীয় ও তুর্কি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, আঙ্কারা সফরে গিয়ে ট্রাম্প এফ-৩৫ বিক্রির পক্ষে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তবে ট্রাম্পের এই ইচ্ছার পথে এখনো সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খোদ মার্কিন কংগ্রেস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইন’ (NDAA) অনুযায়ী, তুরস্ক যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের এফ-৩৫ দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের অনেক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা এখনো তুরস্ককে এই যুদ্ধবিমান দেওয়ার বিরুদ্ধে অনড়। তাছাড়া তুরস্কের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান ও ইসরায়েল-বিরোধী নীতিও মার্কিন কংগ্রেসে বড় বাধা তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি জটিলতা এড়াতে পর্দার আড়ালে এক নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে, যার অধীনে তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা সেই বিতর্কিত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি নিজেদের দেশে অকেজো করে রাখবে অথবা কাতার বা সোমালিয়ার মতো কোনো তৃতীয় দেশে স্থানান্তর করবে। যদি তুরস্ক এটি করতে সম্মত হয়, তবেই মার্কিন কংগ্রেস এফ-৩৫ হস্তান্তরের অনুমতি দিতে পারে।
বৈঠকে বসা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং তুরস্কের এরদোয়ান উভয়েই ট্রাম্পের এই নমনীয় মনোভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। দোভাষীর মাধ্যমে এরদোয়ান সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময় নিজের দেওয়া কথা রাখেন। অতীতেও তিনি আমাদের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমি বিশ্বাস করি, এই শীর্ষ সম্মেলন থেকেই এফ-৩৫ নিয়ে একটি ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে।” যুদ্ধবিমান ছাড়াও বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং তুর্কি যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN)-এর জন্য মার্কিন জেট ইঞ্জিন সরবরাহের বিষয়টি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
|