সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় আজ

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় আজ

আদালত প্রতিবেদক:

১৬ বছর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনা সংবিধানের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’র চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ হতে যাচ্ছে আজ। এই সংশোধনীর কিছু অংশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের ওপর আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রায় ঘোষণা করবেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত (আপিল বিভাগ)।

টানা ৩ দিন সুদীর্ঘ শুনানি শেষ করার পর গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) রায়ের জন্য আজকের দিনটি ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে—হাইকোর্টের আগের রায়টিই বহাল থাকছে, নাকি পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটিকেই সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে।

প্রেক্ষাপট ও হাইকোর্টের রায়:

২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ পাস হয় এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ৩ জুলাই এতে অনুমোদন দেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয়েছিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল—এর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়।

গত বছরের (২০২৪) জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। এই রিটের প্রাথমিক শুনানির পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করেন। সুদীর্ঘ চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রায় দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের ওই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ (বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ও গণভোট বিলোপ সংক্রান্ত ধারা) অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানে যেমন গণভোটের বিধান ফিরে আসে, তেমনি দেশের সাধারণ মানুষের বহু আকাঙ্ক্ষিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফেরার আইনি পথও সুগম হয়।

আপিল ও পক্ষভুক্তদের অবস্থান:

হাইকোর্টের এই রায়ের পর রিটকারীদের একাংশ পুরো সংশোধনীটি বাতিলের দাবিতে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করেন। পাশাপাশি নওগাঁর বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও পৃথক লিভ টু আপিল দায়ের করেন। গত বছরের ১৩ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালত এসব আবেদন মঞ্জুর করলে নিয়মিত আপিল দায়ের করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল বিভাগে এর শুনানি শুরু হয়।

শুনানি চলাকালীন গত বছরের ২ ডিসেম্বর দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষে এই মামলায় পক্ষভুক্ত হন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরবর্তীতে ইন্টারভেনার (সহযোগী মধ্যস্থতাকারী) হিসেবে আরও দুটি সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন এই আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।

গত ৬ জুলাই আপিল বিভাগে এই তিনটি আপিলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। আদালতে রিটকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ইন্টারভেনারদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক, এ এস এম শাহরিয়ার কবির ও আইনজীবী হামিদুল মিজবাহ। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ।

আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই রায়ের ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর এক বিশাল পরিবর্তন নির্ভর করছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই রায়ের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

মন্তব্য করুন