বগুড়ায় তুরস্কের সঙ্গে যৌথ ড্রোন কারখানা হচ্ছে: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী
সচিবালয় প্রতিবেদক: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত বগুড়া জেলাকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ, উন্নয়ন এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতের এক ঐতিহাসিক মেগা পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, “বগুড়া বিমানবন্দরকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের কমার্শিয়াল বিমানবন্দরে রূপান্তর করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সেখানে বিমানবাহিনীর একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন বিমান ঘাঁটির অনুমোদন চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে আগামীতে যে সব সর্বাধুনিক নতুন যুদ্ধবিমান আসবে, সেগুলো এই ঘাঁটির বহরেই সংযুক্ত করা হবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় সুখবর হলো—বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র তুরস্কের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যে অত্যাধুনিক ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেই ড্রোন কারখানাও এই বগুড়াতেই স্থাপন করা হবে।”
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
নিজ এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, “উন্নয়নের বিষয়ে আমার ভেতরে এক ধরণের ইতিবাচক পাগলামি কাজ করে। নিজ এলাকার উন্নয়নে আমি সারা জীবন নানা কাজ করেছি। অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন বিএনপি রাজনীতি করার অপরাধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এখন আমাদের সরকার আসার পর আমি সেগুলো দ্রুত এমপিওভুক্ত করার আন্তরিক চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “বগুড়ায় জনগণের সুবিধার্থে নতুন চারটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এর মাঝে কিছু নামকরণ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অনুশাসন ও নির্দেশনা অনুযায়ী, বিতর্কিত তিনটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় জনগণের চাওয়া অনুযায়ী নতুন ও গ্রহণযোগ্য নামকরণ করা হয়েছে। সত্যি বলতে, কেন্দ্রে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বিগত ১৭ বছর ধরে বগুড়ার কোনো প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি, সেখানকার যোগ্য যুবকদের চাকরি হয়নি, এমনকি যাদের চাকরি ছিল তাদের ভালো কোথাও পদায়নও করা হয়নি। এখন আমাদের বৈষম্যহীন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—সমানতালে দেশের সব জেলার সুষম উন্নয়ন হবে। সেই লক্ষ্য ও আঙ্গিকেই আমি দিনরাত বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।”
সংলাপে প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের ক্রিকেট বোর্ডে পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ওঠা আলোচনার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। মীর শাহে আলম বলেন, “আমাদের সন্তানরা যোগ্যতা অনুযায়ী কিছু করতে গেলেও আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অযাচিত সমালোচনা হয়। আমার নিজের সন্তান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) সম্পূর্ণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট ও নানা কথা এড়াতে এবং আমাদের পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভালের সুবিধার্থে আমি নিজেই তাকে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে বলেছিলাম। সে ইতিমধ্যে পদত্যাগও করেছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ইতিবাচক খবরটির কোনো মিডিয়া নিউজ করেনি।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে আমাদের ছেলেরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে নিগৃহীত ছিল, শত শত রাজনৈতিক মামলার আসামি ছিল। তারা শান্তিতে চাকরি বা ব্যবসা কিছুই করতে পারেনি। এখন যদি তারা মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে দেশের জন্য কিছু করে, তবে তাদের বাধা না দিয়ে সহযোগিতা করা উচিত।”
নিজের নির্বাচনী হলফনামা ও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমার নির্বাচনি হলফনামার যাবতীয় তথ্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সার্ভারে সবার জন্য উন্মুক্ত আছে। সেখানে পরিষ্কার দেওয়া আছে আমার মোট সম্পত্তি ১৮৩৫ শতক। কিন্তু মূল সত্যকে আড়াল বা হাইড করে যদি কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বলে যে—প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আমার সম্পদ ৮ গুণ বেড়েছে, তবে একজন সৎ মানুষ হিসেবে মনে খুব কষ্ট লাগে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো সম্পত্তি কিনিনি, আমার সন্তানরা তাদের কোম্পানির নামে ব্যবসার প্রয়োজনে কিছু জমি কিনেছে। দেশে নতুন ইন্ডাস্ট্রি বা কলকারখানা করতে গেলে জায়গা তো কিনতেই হবে। তবে এই সম্পদ বৈধ নাকি অবৈধ, তা নিয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তবে আমি বলব এর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় তদন্ত হোক।”
চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশের মাঠপর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ এ বছরেই দেশের সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই বিশাল নির্বাচনযজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটও সরকার ইতিমধ্যে বরাদ্দ রেখেছে। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) তাদের প্রাথমিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে দেশের এই বিশাল জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন করা যেমন সরকারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, ঠিক তেমনি সারা দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াটাও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যেন সব ধরণের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সাথে অতিক্রম করতে পারি, সেজন্য আমি দেশবাসীর দোয়া ও সহযোগিতা চাই।” সংলাপে বিএসআরএফ-এর শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ সচিবালয়ে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
|