বগুড়ায় অবশেষে পৃথক দুটি নদীবন্দর স্থাপনের গেজেট প্রকাশ

প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৩ অপরাহ্ণ
বগুড়ায় অবশেষে পৃথক দুটি নদীবন্দর স্থাপনের গেজেট প্রকাশ

বগুড়া প্রতিনিধি: ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে করতোয়া, নাগর, বাঙালী আর যমুনার মতো বড় ৪টি নদী বয়ে গেছে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার বুক চিরে। সম্ভাবনাময় এ জেলায় সব কিছু থাকার পরেও দীর্ঘ বছর যোগাযোগ ও নৌ-উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল স্থানীয় বাসিন্দারা। অবশেষে বগুড়াবাসীর দীর্ঘ ৪৮ বছরের লালিত স্বপ্ন ও বহু আকাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ হতে চলেছে। জেলার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলায় পৃথক দুটি নদীবন্দর স্থাপনের আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

গত বুধবার (৮ জুলাই) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের টিএ শাখা থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই ঐতিহাসিক গেজেটটি প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ছন্দা পাল স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনের খবরটি চাউর হওয়ার পর থেকেই যমুনা পাড়ের অবহেলিত মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান প্রথম বগুড়ার এই অঞ্চলে একটি আধুনিক নদী বন্দর স্থাপনের দূরদর্শী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা কারণে সেই মেগা প্রজেক্টটি দীর্ঘ বছর ধরে ফাইলবন্দী ও থমকে থাকে। দীর্ঘ সময় পর তাঁরই সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়াবাসীর সেই অপূরণীয় স্বপ্ন পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দবাইশা এবং ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি ঘাট এলাকায় এই নদীবন্দর দুটি বাস্তব রূপ পাচ্ছে।

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী রফিকুল ইসলাম এই অর্জনে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “বিগত ১৮ বছর বগুড়ার মানুষ চরম উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হয়েছে। শহীদ জিয়ার নেওয়া উদ্যোগটি ফাইলবন্দী ছিল। আমাদের কৃতি সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়াবাসীর দাবি পূরণ করেছেন। আশা করছি এই নদী বন্দরের পর দ্রুতই সারিয়াকান্দিতে একটি সারকারখানাও স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী।”

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (টিএ) ছন্দা পাল জানান, ‘বন্দর আইন, ১৯০৮’-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ) এই দুই নদীবন্দরের আনুষ্ঠানিক ‘সংরক্ষক’ নিযুক্ত করেছে।

প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, সারিয়াকান্দি নদী বন্দরের উত্তর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে— সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের কালিতলা ঘাটের উত্তরে হাটশেরপুর ইউনিয়নের খুদ্দ বলাইল মৌজার দিঘাপাড়া ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে যমুনা নদী অতিক্রম করে পূর্ব তীরে কাজলা ইউনিয়নের বেড়া পাঁচবাড়িয়া মৌজার জামফল ঘাট পর্যন্ত। আর দক্ষিণ সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে— কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের চরশ্মশানপাড়া মৌজার ময়রাপাড়া ঘাটের (দেবডাঙ্গা) দক্ষিণ দিক থেকে যমুনা নদী অতিক্রম করে পূর্ব তীরে কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের নারাপালা মৌজার মূলবাড়ী পর্যন্ত। নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরে সাধারণ ভরাকটালের সময় সর্বোচ্চ পানির সমতল (হাই ওয়াটার মার্ক) থেকে স্থলভাগের দিকে ৫০ গজ পর্যন্ত এলাকা বন্দরের আওতাভুক্ত থাকবে। এর মধ্যে দিঘাপাড়া ঘাট, কালিতলা ঘাট, ময়রাপাড়া ঘাট (দেবডাঙ্গা), জামফল ঘাট, শোনপচা ঘাটসহ বিদ্যমান সব খাল ও ঘাট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বর্তমানে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও দিনাজপুরের মানুষকে যমুনা সেতু হয়ে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এছাড়া নৌবন্দর না থাকায় জামালপুর-ময়মনসিংহ যেতে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ ঘুরে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট করতে হয়। সাধারণ সময়ে যমুনায় নৌকায় যাতায়াত করতে গেলে তীব্র চরের মুখে পড়তে হয় এবং বর্ষায় উত্তাল ঢেউ ও জলদস্যুদের হামলার ঝুঁকি থাকে।

সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ ফেরি সার্ভিস এবং এই দুটি নৌবন্দর পুরোপুরি চালু হলে মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং সরাসরি রাজধানী ঢাকা পৌঁছানো যাবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং এই অঞ্চলের কৃষকেরা অত্যন্ত অল্প খরচে ও দ্রুততম সময়ে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করতে পারবেন। বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মো. সিরাজ জানান, সকল জটিলতা কাটিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় ধুনট ও সারিয়াকান্দি খুব শীঘ্রই উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক নৌবন্দরে পরিণত হবে।

মন্তব্য করুন