স্পেনে প্রলয়ংকরী দাবানল: ১১ পর্যটকের মৃত্যু
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি স্পেনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের গ্রাস থেকে বাঁচতে নিজেদের গাড়িতে করে পালানোর সময় গাড়ির ভেতর জীবন্ত পুড়ে মারা গেছেন চার ব্যক্তি। উদ্ধার হওয়া রাইট-হ্যান্ড ড্রাইভ (ডান-হাতি স্টিয়ারিং) গাড়ির ধরন দেখে কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, তাঁরা সবাই যুক্তরাজ্য বা ব্রিটিশ নাগরিক।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের অনেকেই স্পেনের লস গাইয়ারদোস জেলার ছোট পাহাড়ি গ্রাম ‘বেদার’ ভ্রমণে আসা বিদেশি পর্যটক হতে পারেন। বর্তমানে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে স্পেন পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীদের বিবরণ অনুযায়ী, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া আগুন থেকে জীবন বাঁচাতে অনেকে দুর্গম বনাঞ্চল ও পাহাড়ি গিরিখাত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখা তাঁদের ঘিরে ফেলে।
স্পেনের দক্ষিণে অবস্থিত আন্দালুসিয়া প্রদেশের আলমেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৪০০ অভিজ্ঞ দমকলকর্মী, বিশেষ সেনাসদস্য এবং স্পেনের সামরিক জরুরি ইউনিট (ইউএমই) একযোগে কাজ করছেন। একই সাথে বিশেষ বিমান ও হেলিকপ্টার থেকে আকাশপথে ওপর থেকে পানি ঢেলে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই এলাকার একটি প্রধান বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে তীব্র বাতাসে শুকনো ঝোপঝাড়ে পড়ার পরই সেখান থেকে এই ভয়াবহ দাবানলের সূত্রপাত হয়। এমন এক আশঙ্কাজনক সময়ে এই দাবানল ছড়িয়ে পড়ল, যখন তীব্র ও অতিষ্ঠ তাপপ্রবাহে অবর্ণনীয়ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্পেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো। আজ শুক্রবার দুই দেশেরই গড় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস ছিল।
আন্দালুসিয়া প্রদেশের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রী আন্তোনিও সান্স এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক জরুরি ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে লস গাইয়ারদোসের দাবানলে ১১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এমন শোক ভাষায় প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সবকিছুই ইঙ্গিত করছে যে মৃতদের বেশির ভাগ কিংবা সবাই বিদেশি পর্যটক নাগরিক।’ তিনি এই দাবানলটিকে ‘অত্যন্ত জটিল, দুর্গম ও অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া’ আগুন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ যে এলাকায় আগুন লেগেছে, সেখানে অনেক গিরিখাত এবং ঘন বনাঞ্চলের মধ্যে ছোট ছোট মানুষের বসতি রয়েছে।
আন্দালুসিয়ার প্রাদেশিক সরকার জানিয়েছে, আগুন লাগার পর থেকে জরুরি সেবা বিভাগে ১৫০টিরও বেশি আকুল ফোনকল আসে। গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া একটি প্রধান মহাসড়ক থেকেও আগুনের বিশাল শিখা ও কালো ধোঁয়া স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। সান্স আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এছাড়া প্রায় ৩,১৫০ হেক্টর (৭,৭৮০ একর) সমৃদ্ধ বন ও কৃষিজমি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আন্দালুসিয়ার প্রাদেশিক সরকারের প্রধান হুয়ান ম্যানুয়েল মোরেনো বনিয়া স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, আরও ১৯ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁদের সন্ধানে ড্রোন ও স্নিফার ডগ দিয়ে তল্লাশি চলছে।
দাবানল লোকালয়ে চলে আসায় সমস্ত আঞ্চলিক সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫০ জনকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিণতিতে গভীর শোক ও মর্মবেদনা প্রকাশ করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে লিখেছেন, দাবানলের এমন ভয়াবহ পরিণতিতে তিনি ‘গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত’। গত মে মাসেই প্রধানমন্ত্রী সানচেজ সতর্ক করে বলেছিলেন, এ বছর গ্রীষ্মে দাবানল মোকাবিলায় স্পেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক প্রস্তুতি মোতায়েব করবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আন্দালুসিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি রয়েছে। মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনে তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যা বড় ধরনের দাবানলের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
|