ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা পলাতক শেখ হাসিনার: রয়টার্স

প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৫ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা পলাতক শেখ হাসিনার: রয়টার্স
অনলাইন ডেস্ক ঃ ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফেরার পর তিনি নিজে এবং বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অন্য শীর্ষস্থানীয় ও জ্যেষ্ঠ পলাতক নেতারা একযোগে দেশের আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দিল্লির নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে এসব কথা বলেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগের পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  সাক্ষাৎকারে পলাতক শেখ হাসিনা বলেন, “দুই বছর আগে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলেও, এখন আমি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে দেশের প্রচলিত আইন ও আদালতের মুখোমুখি হতে চাই।”

নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি জানি দেশে ফেরার পর বর্তমান কর্তৃপক্ষ আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি আমাকে হত্যাও করা হতে পারে। তারপরও আমাকে মাতৃভূমিতে ফিরে যেতেই হবে। আমার দলের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর ওপর এখন দেশজুড়ে ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি আমার মৃত্যুও হয়, আমি দেশের মাটিতেই মরতে চাই—যেখানে আমার মা-বাবা সমাহিত আছেন এবং যেখানে আমাদের পরিবারের রক্ত ঝরেছে।”

রয়টার্স বলছে, দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাব্য সুনির্দিষ্ট সময়কাল প্রকাশ করলেন। একই সঙ্গে দেশে ফিরে এককভাবে নয়, বরং দলগতভাবে আওয়ামী লীগের পলাতক অন্য সব নেতারাও তাঁর সঙ্গে একই দিনে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে তিনি পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ, কখন আত্মসমর্পণ করবেন কিংবা ঠিক কোন আদালতে গিয়ে দাঁড়াবেন—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে করা একটি মন্তব্যকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগের হামলার পর সহিংসতায় রূপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হলে এই আন্দোলন দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তবে ভারত থেকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার এই সমস্ত অভিযোগ আবারও অস্বীকার করেছেন। জাতিসংঘের এক নিরপেক্ষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অভ্যুত্থান দমনে শেখ হাসিনা সরকারের চালানো অভিযানে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

রয়টার্স তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দুই বছরের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা চালানো বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন ও মেরুকরণ আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে, তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান টানাপোড়েনপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ শেখ হাসিনাকে ভারত রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার পর ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছিল। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে দেশে ফেরত পাঠাতে একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “ঢাকার বর্তমান কর্তৃপক্ষ আমাকে দেশে ফেরত নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। তাই আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারা ফেরত নেওয়ার আগে আমি নিজেই দেশে যাব।” তাঁর এই বক্তব্যের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে গত এপ্রিলে দিল্লি জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।

আদালতে যৌথ আত্মসমর্পণের বিষয়ে শেখ হাসিনা দিল্লির নিজ বাসভবন থেকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই বর্তমানে আত্মগোপনে চরম কষ্টে আছেন। তাই আমি তাদের বলেছি, এবার আমি নিজে আগে দেশে ফিরছি এবং একদিন তোমরাও সবাই আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে বুক ফুলিয়ে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।” শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার পরিকল্পনায় থাকা নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধেও ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে।

কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কোনোভাবেই উদ্বিগ্ন নন উল্লেখ করে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের রাজনৈতিক বন্দিত্ব ও ১৯৮১ সালে নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার ইতিহাস স্মরণ করেন তিনি। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ও তিনি কারাবন্দি হয়েছিলেন।

সবশেষে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে কোনো রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা দাবি করেন, “একটি সরকার দীর্ঘ ২০ বছর কাজ করলে কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুল বিচার করার একমাত্র নৈতিক অধিকার দেশের সাধারণ জনগণের। আমি সেই চূড়ান্ত বিচার বাংলাদেশের মানুষের ওপরই ছেড়ে দিলাম।” একই সাথে দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি ভারতে বসেই অনলাইনে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেন।

মন্তব্য করুন