চীনে খামার ধসে পালাল ৯০০ সাপ; বন্যা-টর্নেডোতে বিপর্যস্ত দেশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এল নিনোর প্রভাবে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া দেশটির বার্ষিক বন্যা মৌসুমের শুরুতেই একের পর এক বন্যা, ভূমিধস, প্রবল বৃষ্টিপাত ও শক্তিশালী টর্নেডোর আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেই এক নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের হেংঝৌ শহরে। সেখানকার একটি বিশাল সাপের খামার বন্যার পানিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়লে খামার থেকে একযোগে প্রায় ৯০০টি সাপ বের হয়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার কর্দমাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশের লাঠি ও জাল দিয়ে সাপ ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। স্থানীয় কর্মকর্তা উ ঝি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পালিয়ে যাওয়া সাপগুলোর বেশিরভাগই বিষধর নয়। তবে সুরক্ষার স্বার্থে সেগুলো দ্রুত অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে মাছ ধরার জাল ও স্টান গান (Stun gun) ব্যবহার করে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল দিনরাত কাজ করছে। তিনি গ্রামবাসীদের কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, বাড়ির আশেপাশে কোনো সাপ দেখলে তারা যেন নিজেরাই সেটি ধরার বা মারার চেষ্টা না করেন।
দেশজুড়ে লাশের মিছিল ও সর্বোচ্চ রেড অ্যালার্ট:
চীনে চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইতিমধ্যে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের লংনান এলাকার একটি পাহাড়ি গ্রামে হঠাৎ প্রলয়ঙ্করী ভূমিধসের কারণে আস্ত একটি বসতির ৩৩ জন মানুষ জীবন্ত মাটিচাপা পড়েন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে মধ্য চীনে প্রবল বৃষ্টি ও শক্তিশালী টর্নেডোর আঘাতে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। সোমবার রাতে হুবেই প্রদেশের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হুয়াংগ্যাং-এ আঘাত হানা এই টর্নেডোতে ১৭৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঝড়ের তাণ্ডবে শত শত বাড়িঘরের ছাদ, সড়ক, কৃষিজমি ও গাছপালা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদ ওয়াং শিয়াওলিং জানান, হুবেই প্রদেশে টর্নেডো অত্যন্ত বিরল ঘটনা, এর আগে সর্বশেষ ২০২১ সালে সেখানে টর্নেডো রেকর্ড করা হয়েছিল।
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় সোমবার মধ্যরাতে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজি অঞ্চলে বন্যা সতর্কতা সর্বোচ্চ ‘রেড’ স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের ৫৫টি নদীর ৭০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানির স্তর বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং কিংসুই নদীতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বন্যা রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের জরুরি নির্দেশ ও টাইফুন বাভি’র শঙ্কা:
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি (CCTV) জানিয়েছে, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সর্বোচ্চ জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে দেশের সমস্ত নদী, হ্রদ, জলাধার এবং ভূমিধসপ্রবণ পাহাড়ি এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। দুর্যোগ মোকাবেলায় ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি কেন্দ্রীয় উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দল রাবার বোট নিয়ে দুর্গত এলাকায় কাজ করছে।
এদিকে অলাভজনক ঝুওমিং দুর্যোগ তথ্যসেবা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত দক্ষিণ চীনের গুয়াংসি অঞ্চলে অন্তত ৪ হাজার মানুষ জরুরি ত্রাণের জন্য আবেদন করেছেন। পানিসম্পদ ও জলবিদ্যুৎ গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক লিউ চ্যাংজাং ও বিশেষজ্ঞ লিউ চাংজুন সতর্ক করে বলেছেন, শুধু বড় নদী নয়, মাঝারি ও ছোট নদী এবং পাহাড়ি ঢলপ্রবণ এলাকাগুলোর দিকেও সমান নজর দিতে হবে।
চীনের এই ক্ষতবিক্ষত পরিস্থিতির মাঝেই আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও একটি বড় দুঃসংবাদ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ধেয়ে আসা সুপার টাইফুন ‘বাভি’ আগামী রবিবার (১২ জুলাই) চীনের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে চীনের বন্যা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
|