যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি নারীর প্রায় ৮০০ কোটি টাকার প্রতারণা: সাড়ে ৬ বছরের জেল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির (মেডিকেইড) আওতায় বয়স্কদের ডে কেয়ার সেন্টার পরিচালনার আড়ালে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা) আত্মসাতের অভিযোগে জাকিয়া খান (৫৫) নামের এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীকে সাড়ে ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালত।
মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর রায় ও প্রতারণার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ নাতাশা মার্লে এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচারক জাকিয়া খানকে ৭৬ মাস বা সাড়ে ছয় বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাঁর অবৈধভাবে অর্জিত নগদ অর্থ, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও দুটি বাড়িসহ মোট ৫০ লাখ ডলারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মেডিকেইড তহবিলের ক্ষতিপূরণ বাবদ তাঁকে হাতিয়ে নেওয়া ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পুরোপুরি পরিশোধের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, জাকিয়া খান নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের কনি আইল্যান্ড এলাকায় ‘হ্যাপি ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনকরপোরেটেড’ এবং ‘ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনকরপোরেটেড’ নামে দুটি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করতেন।
এর পাশাপাশি তিনি ‘রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং ইনকরপোরেটেড’ নামে একটি হোম হেলথ কেয়ার ফিসকাল ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ছিলেন। জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া বিপুল কালো টাকা হস্তান্তর ও তার আসল উৎস আড়াল করতে ‘তানউই সার্ভিসেস ইনকরপোরেটেড’ নামের অপর একটি ভুয়া শেল কোম্পানি ব্যবহার করতেন তিনি।
ব্রুকলিন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের তদন্তে উঠে আসে, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে একদল অসাধু মার্কেটারের সহায়তায় জাকিয়া খান মেডিকেইডের সুবিধাভোগী প্রবীণ নাগরিকদের নগদ অর্থ ও বিভিন্ন অবৈধ সুবিধার টোপ দিয়ে তাঁর ডে কেয়ার সেন্টারে তালিকাভুক্ত করাতেন।
পরবর্তীতে গ্রাহকদের ঘুষ ও কিকব্যাকের বিনিময়ে মেডিকেইড কর্তৃপক্ষের কাছে এমনভাবে বিল দাখিল করা হতো, যেন তাঁদের পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে তাঁদের কোনো প্রকার শারীরিক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হতো না। এভাবে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে জাকিয়া খান ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ভুয়া বিল জমা দেন, যার বিপরীতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার ছাড় করে।
২০২৩ সালে মেডিকেইডের সেবাগ্রহীতা সেজে এক ছদ্মবেশী ফেডারেল গোয়েন্দা কর্মকর্তা জাকিয়া খানের অফিসে প্রবেশ করেন। সেখানে ঘুষের নগদ অর্থ লেনদেন করার সময় গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়েন জাকিয়া। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, টেবিলের ওপর মার্কিন ডলারের বান্ডিল সাজিয়ে অত্যন্ত উৎফুল্ল চিত্তে তা গুনছেন তিনি।
গোয়েন্দা জালে চূড়ান্তভাবে ফেঁসে যাওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে জাকিয়া খান আদালতের কাছে সরকারের সাথে প্রতারণা, জালিয়াতির ষড়যন্ত্র এবং স্বাস্থ্যসেবায় অবৈধ লেনদেনের সমস্ত অভিযোগ স্বীকার করে নেন।
রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা এক বিবৃতিতে জানান, “এই রায় আমাদের ডিস্ট্রিক্টে আর্থিক অপরাধ দমনে এক জোরালো বার্তা দিল। সাধারণ আমেরিকান করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ জালিয়াতির হাত থেকে সুরক্ষা দিতে বিচার বিভাগ সর্বদা আপসহীন। স্বাস্থ্যসেবার মতো মহৎ খাতকে দুর্নীতির হাতিয়ার বানানো যেকোনো অসৎ প্রতিষ্ঠান মালিকদের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ কঠোর আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রাখব।”