ফ্রান্সের ঋণসংকট কি এবার ছড়িয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রেও
অনলাইন ডেস্ক: সামর্থ্যের অতিরিক্ত ব্যয়, লাগামহীন সরকারি ঋণ, ঋণের সুদ পরিশোধের বিপুল ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি এই সংকটের পর আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে—ফ্রান্সের মতো ভয়াবহ ঋণসংকটে কি তবে পড়তে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও?
পশ্চিমা অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যসহ উন্নত বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে সরকারি ঋণ আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ঋণ নেওয়ার সুদের হার চড়া হলেও, রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন কিংবা কর বাড়ানোর মতো রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সদিচ্ছার অভাব সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। তবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, কিছু কাঠামোগত মিল থাকলেও ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ এক নয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রান্সের মতো তাৎক্ষণিক তীব্র ঋণসংকটের আশঙ্কা বেশ কম।
ইউরোপীয় কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যয় গত কয়েক দশক ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা একসময় যে অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি৭-এর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ জি৭ভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত সরকারি ঋণ তাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির পরিমাণকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। বর্তমানে ফ্রান্সের মোট সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির প্রায় ১১৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৫.৪ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পুরোপুরি উদ্বেগমুক্ত নয়। দেশটির বর্তমান সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ লাখ কোটি ডলার, যা তাদের বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মার্কিন বাজেট ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি। শুধু তাই নয়, সরকারি ঋণের সুদ মেটানোর বার্ষিক খরচ ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে—যা মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ, সরকার সংগৃহীত প্রতি সাত ডলার করের এক ডলারই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
তবে এরপরেও ফ্রান্সের মতো আকস্মিক বিপর্যয়ে না পড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দেশটি বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলারের নিয়ন্ত্রক। বিশ্ববাণিজ্যের সিংহভাগই ডলারে সম্পাদিত হয় এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের কারণে ডলারে ওপর বিশ্ববাসীর আস্থাও সুদৃঢ়।
এ কারণে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সুদের হার অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি মার্কিন অর্থনীতি অত্যন্ত বৃহৎ ও বহুমুখী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতে বিশাল বিনিয়োগ দেশটির অর্থনীতিকে বাড়তি প্রবৃদ্ধি দিচ্ছে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে। দেশটির সামনে অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ঋণসীমা নিয়ে দ্বন্দ্ব। আগামী বছর মার্কিন প্রশাসনকে আবারও আইনগতভাবে দেশের সর্বোচ্চ ঋণসীমা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নতুন কংগ্রেসের মধ্যে এ নিয়ে সমঝোতা না হলে বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনই ফ্রান্সের মতো সরাসরি ঋণসংকটে না পড়লেও, লাগামহীন ঋণপ্রবণতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতিকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সকালবেলা/নুসরাত