বিদ্যুৎ বিল কমানোর সহজ উপায় ও ঘরোয়া কৌশল
লাইফস্টাইল ডেস্ক : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সেবার মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা এবং মাসিক পারিবারিক বাজেটের ওপর এক ধরনের নতুন ও বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিলের চড়া অঙ্ক মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের বহু মানুষ। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিলকে একটি সাশ্রয়ী ও নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হলে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস এবং ঘরোয়া যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আনা জরুরি। সঠিক ও সচেতন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে কোনো প্রকার বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই বাসাবাড়ি এবং ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল ও জীবনধারা’ এবং ‘স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট, টেকসই গৃহস্থালি প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর অব্যর্থ ঘরোয়া কৌশলসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
সাধারণত আমাদের অজান্তেই বাসাবাড়ির কিছু ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্র প্রতি মাসে একটি বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ গ্রাস করে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরের এয়ার কন্ডিশনার (AC), পানি গরম করার গিজার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, কাপড় সোজা করার ইস্ত্রি (Ironing) এবং রাইস কুকার বা বৈদ্যুতিক চুলা সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ বা কনজিউম করে। অপরদিকে, আধুনিক এলইডি (LED) বাল্ব, সিলিং ফ্যান, টেলিভিশন এবং মোবাইল ফোনের চার্জার তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে।
বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রধান ঘরোয়া কৌশলসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ফ্যান, লাইট, টিভি ও কম্পিউটারের সুইচ বন্ধ রাখা আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অনেক সময় অসচেতনতার কারণে বাথরুম, রান্নাঘর কিংবা বারান্দার লাইট দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকে, যা মাস শেষে অনর্থক বড় বিল ডেকে আনে। এছাড়া কোনো ডিভাইস চার্জ বা ব্যবহারের পর ইস্ত্রি, ওভেন কিংবা মোবাইল চার্জারের প্লাগ সকেট থেকে সম্পূর্ণ খুলে (Unplug) রাখা উচিত। কারণ প্লাগ সংযুক্ত থাকলে 'ফ্যান্টম লোড' বা স্ট্যান্ডবাই মোডের কারণেও সামান্য পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় হতে থাকে।
পুরনো দিনের ফিলামেন্ট বাল্বের পরিবর্তে ঘরে শতভাগ এলইডি বা এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করলে আলোর মান ঠিক রেখেই বিদ্যুৎ খরচ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা যায়। এছাড়া নতুন ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন কিংবা ঘরের পানির পাম্প কেনার ক্ষেত্রে অবশ্যই ‘ইনভার্টার’ (Inverter Technology) প্রযুক্তির স্টার রেটিং সমৃদ্ধ এনার্জি স্টার সার্টিফাইড ডিভাইস বেছে নেওয়া উচিত। এই ইনভার্টার প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ যন্ত্রের চেয়ে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
গ্রীষ্মকালে এসি চালানোর সময় এর তাপমাত্রা সর্বদা ‘২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস’ (25°C)-এ সেট করে রাখা সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এই তাপমাত্রায় কম্প্রেসরের ওপর চাপ কম পড়ে এবং ঘর দ্রুত আরামদায়ক ঠাণ্ডা হয়। ঘর নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর এসি বন্ধ করে সাধারণ সিলিং ফ্যান চালানো যেতে পারে। এছাড়া রাতে ঘুমানোর সময় এসির ‘টাইমার’ (Timer) ও ‘স্লিপ মোড’ ফিচারটি ব্যবহার করলে গভীর রাতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা সম্ভব।
বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত নিম্নমানের তার, ত্রুটিপূর্ণ ওয়্যারিং বা দুর্বল বৈদ্যুতিক সংযোগও অনেক সময় অলক্ষ্যে বিদ্যুৎ অপচয় বা বিদ্যুৎ লিক হওয়ার প্রধান কারণ হতে পারে। পুরনো হয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বা সাব-স্টেশনের ক্রটির কারণেও ভোল্টেজ আপ-ডাউন করে এবং অতিরিক্ত রিডিং বা খরচ বাড়ায়। তাই প্রতি বছর অন্তত একবার একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা ঘরের পুরো ওয়্যারিং ও মেইন সুইচ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
দিনের বেলা ঘরের জানালা খুলে দিয়ে কৃত্রিম লাইটের বদলে প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা উচিত। এছাড়া ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়ার সময় গরম পানির সেটিং (Heater Mode) বন্ধ বা কম রাখলে বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। মাইক্রোওভেনের পরিবর্তে সাধারণ গ্যাস বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার এবং সম্ভব হলে বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় ছোট আকারের সৌর বিদ্যুৎ বা সোলার প্যানেল (Solar Power) স্থাপন করে দিনের আলোর বড় অংশ ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিল সাধারণত গ্রাহকের মোট ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে 'স্ল্যাব ব্যবস্থা' বা বিভিন্ন স্তরের মূল্যে নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ, আপনি যত কম ইউনিট ব্যবহার করবেন, আপনার প্রতি ইউনিটের দাম তত কম বা সর্বনিম্ন স্ল্যাবে থাকবে। কিন্তু ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট ইউনিট (যেমন- ৭৫, ২০০ বা ৩০০ ইউনিট) পার হয়ে গেলেই পরবর্তী প্রতি ইউনিটের মূল্য জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, প্রতি মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়মিত মনিটর করে ব্যবহারকে নিচের স্ল্যাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, যা আপনার পকেটের খরচকে এক ধাক্কায় অনেকটাই নামিয়ে আনবে।
জান্নাত সকালবেলা
|