চট্টগ্রাম বোর্ডের ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর তথ্য ফাঁস
নিজস্ব প্রতিবেদক: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীদের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারি তিনটি পোর্টালে সুরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও চরম নিরাপত্তা ত্রুটি প্রকাশ্যে এসেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে। বিগত চার বছরে পরীক্ষা দেওয়া ১০ লাখের বেশি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর স্পর্শকাতর সব ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে অননুমোদিত বিভিন্ন বেসরকারি ওয়েবসাইটে।
উন্মুক্ত হয়ে পড়া এই বিপুল তথ্যের কারণে সাইবার জগতে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়েছে। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অভিভাবকের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য পাবলিক ডোমেইনে চলে আসায় ভঙ্গ হয়েছে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ এবং আন্তর্জাতিক ডেটা প্রাইভেসি নীতিমালা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অননুমোদিত অন্তত তিনটি সাইটে শিক্ষার্থীরা তথ্য দেখতে পাচ্ছেন, যার দুটি ভারসেল ডট অ্যাপ (vercel.app) এবং একটি গিটহাব ডট আইও (github.io) ডোমেইনে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ওয়েবসাইটে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীদের নাম, রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেরিট র্যাংক, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ ও বিষয়ভিত্তিক নম্বরসহ মোট ১৪ ধরনের ব্যক্তিগত ও শনাক্তযোগ্য তথ্য (PII) উন্মুক্ত রয়েছে। সরকারি অফিসিয়াল পোর্টালে সার্চ দিলে সর্বোচ্চ ১১টি সাধারণ তথ্য মিললেও এসব থার্ডপার্টি সাইটে জন্মতারিখ ও জিপিএ নম্বরসহ ৩টি অতিরিক্ত ডেটা পাওয়া যাচ্ছে।
সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭ লাখ ২২ হাজার ৩৯৯ জন এসএসসি এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৩ লাখ ১০ হাজার ১৩৬ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থী অংশ নেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫ জন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উপাত্ত এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজ বা এপিআই (API) দুর্বলতা না থাকলে বা হ্যাক না হলে এসব গোপনীয় তথ্য সরাসরি বাইরে আসার কোনো সুযোগ নেই। এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত থাকলে সাইবার অপরাধীরা খুব সহজেই ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি (আইডেন্টিটি থ্যাফট) করতে পারে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার বা প্রতারক চক্র শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নম্বরে কল করে মানসিক হয়রানি বা আর্থিক প্রতারণার সুযোগ পায়।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মু. সাক্বী কাওসার এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, “যেসব অতিরিক্ত তথ্য শিক্ষা বোর্ড নিজেরা প্রকাশ করেনি, সেগুলো অননুমোদিত ওয়েবসাইটে পাওয়ার অর্থ স্পষ্ট—তাদের ডেটাবেজ হ্যাক বা বড় ধরনের লিক হয়েছে। শুধু ডেটা স্ক্র্যাপিং করলে এই বাড়তি তথ্য পাওয়া সম্ভব হতো না। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা এবং এর সম্পূর্ণ দায়ভার বোর্ডকেই নিতে হবে।”
একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঘটনাটি বোর্ডের সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাইবার সুরক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বহুমুখী আর্থিক ও সামাজিক হয়রানির মুখে ফেলতে পারে। দ্রুততম সময়ে বোর্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”
তবে তথ্য ফাঁসের এই চিত্র অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, “বোর্ড থেকে কোনো তথ্য উন্মুক্ত বা কাউকেও দায়িত্ব প্রদান করা হয়নি। আমাদের মূল ডেটাবেজ হ্যাক হওয়া অসম্ভব। ফলাফল প্রক্রিয়াকরণের জন্য আমরা বুয়েট, চিটাগং ডকইয়ার্ড ও টেলিটককে ডেটা পাঠাই; সেখান থেকে কোনো প্রযুক্তিগত ভুল হয়ে থাকতে পারে।” তবে এই ঘটনায় বড় কোনো ক্ষতির শঙ্কা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
|