চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৩ জনের মৃত্যু এবং দুর্গত সাড়ে ৮ লাখ

প্রকাশ: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৩ জনের মৃত্যু এবং দুর্গত সাড়ে ৮ লাখ
পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা (ফাইল ছবি)।

অনলাইন ডেস্ক: সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা রেকর্ড বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ। বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৯ জন।

সংশ্লিষ্ট সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, আকস্মিক এই বন্যায় পাঁচ জেলায় সব মিলিয়ে ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ওনাদের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নিয়েছেন ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মৃত ৪৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে, সেখানে ২৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় ১১ জন, পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে ৩ জন এবং বান্দরবানে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ৩৯ জনের মধ্যে চট্টগ্রামে ১২ জন, কক্সবাজারে ২৪ জন, খাগড়াছড়িতে ১ জন এবং বান্দরবানে ২ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চলতি বন্যায় ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। এই এক জেলাতেই ৬ লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী ও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ BOUNDARY ৪১৭ জন এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ৮ লাখ ৩৫০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বিপন্ন ও উপদ্রুত মানুষের জানমাল রক্ষার্থে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এই পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যেখানে এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলাভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে চট্টগ্রামে ৬৭০টি, কক্সবাজারে ৬৪০টি, রাঙ্গামাটিতে ৪৭টি, খাগড়াছড়িতে ১৫০টি এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক সচল রয়েছে।

আশ্রয় নেওয়া ও দুর্গত মানুষের মাঝে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯১ দশমিক ১ লাখ নগদ টাকা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় বোটের মাধ্যমে রান্না করা খাবার, শিশু খাদ্য, ডায়াপার ও নারীদের জন্য জরুরি স্যানিটারি ন্যাপকিনও বিতরণ করা হচ্ছে।

বাসস্থান হারানোর পাশাপাশি এই বন্যায় পাঁচ জেলার কৃষিখাতে ও ফসলের ওপর নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। মাঠে থাকা হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে পচে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টরের বেশি গ্রীষ্মকালীন সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর আউশ ধান, ৪৭০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫৫ হেক্টর সবজি এবং ১৫৬ হেক্টর অর্থকরী পান বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ৭১৭ হেক্টর আউশ ধান, ১৫৮ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৮৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং পাহাড়ি চাষাবাদ তথা ৭৪৩ হেক্টর আদা ও ৬৪৮ হেক্টর হলুদ খেত পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জুম চাষসহ আউশ ধান ও সবজি চাষেও বড় ধরনের অপরূণীয় ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে, যা আগামীতে এই অঞ্চলে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন