পলাতকদের ফেরাতে সব বিদেশি সংস্থার সাথে কাজ করছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ: বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
পলাতকদের ফেরাতে সব বিদেশি সংস্থার সাথে কাজ করছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (ছবি: সংসদ টিভি)।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ বিগত সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সব আসামিকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় সোপর্দ করতে সরকার কোনো ধরনের গাফিলতি করবে না বলে জাতীয় সংসদে সুস্পষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় ঢাকা-১৪ আসনের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সংসদ সদস্যদের দীর্ঘ আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। পরে স্পিকার এ বিষয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংসদকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রুলিং ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সাবেক আইজিপিসহ অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সকল অপরাধী ও আসামিকে শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে ও সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”

সাবেক পুলিশপ্রধানকে ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট অগ্রগতির কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাঁর বর্তমান অবস্থান চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা, আইনি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, ভুয়া ও একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং দেশে-বিদেশে গড়ে তোলা তাঁর সকল অবৈধ সম্পদ চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে। সরকার আইনের শাসন, সুষ্ঠু বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফেরানোর আইনি লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দুবাইয়ের আদালতে বিষয়টি আইনিভাবে পরিচালনার জন্য গত ৩০ জুলাই দেশটির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ল’ ফার্ম ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় সাবেক আইজিপির বর্তমান অবস্থান সংক্রান্ত গণমাধ্যমের খবরের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য ও উপযুক্ত কূটনৈতিক সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, ওই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা ইতোমধ্যে ৭ থেকে ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। ওই শাসনামলে পুলিশ ও জেল হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৮টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বর্বর নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৩ জন।

গুমের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারিভাবে নথিভুক্ত গুমের সংখ্যা ৬৮৪টি হলেও ‘মায়ের ডাক’ ও ‘অধিকার’-সহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে তা ৭০৯টির বেশি। এছাড়া গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৮৫০ জনকে। ওই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে ২ হাজার ৬৩০ জনের এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৩ জন; যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুসন্ধানী রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন, যার বেসরকারি হিসাব ২ হাজারের বেশি। শহীদদের সিংহভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক রাইফেল ও শটগানের প্রাণঘাতী বুলেটে বিদ্ধ হয়ে মারা যান।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে বিগত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূল সহযোগী আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, গুম ও শতাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে। নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

উল্লেখ্য, দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ দিনের সময়সীমা থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাত্র তিন দিনের মধ্যে ১৪৪ পৃষ্ঠার আইনি নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছিল।

সংসদে প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় আরও অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, পটুয়াখালী-৪ আসনের এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ফরিদপুর-৪ আসনের এম শাহিদুল ইসলাম, রংপুর-৪ আসনের আখতার হোসেন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, মারজিয়া বেগম ও তাসমিয়া প্রধান।

মন্তব্য করুন