এক শহরে দুই মহাদেশের সংযোগ

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৮ অপরাহ্ণ
এক শহরে দুই মহাদেশের সংযোগ

স্পোর্টস ডেস্ক: ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই সম্পূর্ণ বদলে যায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত ‘লা শাপেল’ (La Chapelle) নামের এলাকার চিরচেনা পরিবেশ। এখানকার রাস্তাঘাট, ছোট-বড় রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের আড্ডা—সবখানেই দৈনন্দিন সব আলোচনা ছাপিয়ে পুরো দখল নিয়ে নেয় ফুটবল।

তবে চলতি ২০২৬ সালের বিশ্ব আসরে লা শাপেলের চিত্রটি অন্যান্যবারের চেয়ে একটু আলাদাই বলা চলে। আগে যেখানে কেবল একটি বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হতো, এবার সেখানে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য পাশাপাশি দুটি বিশালাকার স্ক্রিনে খেলা দেখার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাও আবার একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ম্যাচ! বিশেষ করে ফ্রান্স এবং আফ্রিকার কোনো দেশের খেলা একই সময়ে অনুষ্ঠিত হলে, দুই পর্দায় সমান্তরালে দেখানো হয় দুটি খেলাই। সেদিন যেমন এক পর্দায় চলছিল গ্রুপ পর্বের তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ফ্রান্স বনাম নরওয়ে ম্যাচ, ঠিক তার পাশের স্ক্রিনেই চলছিল সেনেগাল বনাম ইরাকের মাঠ কাঁপানো লড়াই। দুই ম্যাচ একসাথে চললেও লা শাপেলবাসীর মনোযোগ বা করতালিতে কোনো কমতি ছিল না।

এই অদ্ভুত ও সুন্দর সহাবস্থানের কারণ শুধুই ফুটবলীয় বিনোদন নয়। আসলে এই এলাকার সিংহভাগ মানুষের নাড়ির টান ও শিকড় গাঁথা রয়েছে দুই ভিন্ন মহাদেশে। এবার সেনেগালের জাতীয় দলে হয়ে খেলছেন এমন একাধিক ফুটবলার রয়েছেন, যাঁদের জন্ম খোদ ফ্রান্সে। আবার ফ্রান্সের মূল দলে খেলছেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অনেক তারকা খেলোয়াড়। ফলে লা শাপেলে পাশাপাশি দুই বড় পর্দায় ফ্রান্স ও সেনেগালের খেলা দেখাটা সেখানকার মানুষের জন্য এক ধরনের আত্মিক ও মানসিক সংযোগ।

এমন মিশ্র আবেগের দৃশ্য এর আগেও দেখা গেছে। গত জানুয়ারিতে সেনেগাল ‘আফ্রিকান কাপ অব নেশনস’ জেতার পর লা শাপেলের রাজপথে প্রবাসীদের ঢল নেমেছিল। যদিও পরবর্তীতে মাঠে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে সেনেগালের সেই শিরোপা কেড়ে নিয়ে রানার্স-আপ মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে আফ্রিকার ফুটবল সংস্থা (CAF)। তবে সেনেগালের সেই দুঃখ ভুলে পাঁচ মাস পর বিশ্বকাপের আরেক রাতে একই আনন্দঘন চিত্র দেখা গেল লা শাপেলে। একদিকে ফরাসি ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলের চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক, অন্যদিকে সেনেগালিজ তারকা পাপা গেয়ির দর্শনীয় জোড়া গোল। দুই ম্যাচেই সমপরিমাণ উল্লাস, দুই দলেই সমান আনন্দ। এখানে জয় বা ট্রফি কোনো একক দেশের সীমানায় বন্দি থাকে না।

এই অনন্য বাস্তবতার মূল কারণ হচ্ছে ফ্রান্সের নমনীয় অভিবাসন কাঠামো। ফ্রান্সে দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। ফলে একজন খেলোয়াড় এক দেশে জন্মালেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের পূর্বপুরুষের দেশের হয়ে খেলার আইনগত অধিকার পান। কারো জন্ম হয়তো প্যারিসের আধুনিক হাসপাতালে, কিন্তু তাঁর পারিবারিক শিকড় সেনেগালে। কারো জন্ম নরম্যান্ডিতে, কিন্তু হৃদয় স্পন্দিত হয় আলজেরিয়ার জন্য। এই কারণেই ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, অরেলিয়ান চুয়ামেনি ও দায়ো উপামেকানোর মতো বিশ্বসেরা ফুটবলাররা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও মাঠ কাঁপাচ্ছেন ফ্রান্সের জার্সিতে।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের বাইরে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলারই খেলছেন সবচেয়ে বেশি—সংখ্যাটা আকাশছোঁয়া, ৯৯ জন! এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে নেদারল্যান্ডস, যেখানে জন্ম নেওয়া ৬৭ জন ফুটবলার খেলছেন বিভিন্ন দেশের হয়ে। এছাড়া জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ৫০ জন এবং ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ৪৭ জন ফুটবলার রয়েছেন অন্য দেশের স্কোয়াডে। কিন্তু সবাইকে বিশাল ব্যবধানে ছাপিয়ে শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স, যেন ফরাসি ফুটবলের এক বিশাল স্রোতধারা বইছে এই বিশ্বকাপে।

ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই ৯৯ জনের মধ্যে কেবল ২৩ জন খেলছেন মূল ফ্রান্স জাতীয় দলে। বাকিদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ জন খেলছেন আলজেরিয়ার হয়ে। যার মধ্যে অন্যতম বড় নাম গোলকিপার লুকা জিদান, যিনি ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে। জিদানের নিজের জন্ম আলজেরীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে হলেও তিনি খেলে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন; আর তাঁর ছেলে জন্মেছেন ফ্রান্সে, অথচ খেলছেন আলজেরিয়ার হয়ে! এছাড়া হাইতিতে ১২ জন, কঙ্গোতে ১১ জন, সেনেগালে ১০ জন, আইভরি কোস্টে ৮ জন, তিউনিসিয়ায় ৭ জন, মরক্কোয় ৬ জন, কেপ ভার্দে ও ঘানায় ৩ জন করে এবং মিসর, কাতার ও স্পেন দলে ১ জন করে ফুটবলার রয়েছেন, যাঁদের জন্ম আদতে ফরাসি ভূমিতে।

এর পেছনে জড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। আফ্রিকার বহু দেশ একসময় সরাসরি ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। সেই ঔপনিবেশিক সম্পর্ক রাজনৈতিকভাবে শেষ হলেও আজও তা সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাত্রায় গভীরভাবে রয়ে গেছে। তাই এই অভিবাসন শুধু ভৌগোলিক সীমানা বদল নয়, এটি আত্মপরিচয়েরও এক জটিল প্রশ্ন।

প্যারিস এখন সেই বৈশ্বিক ফুটবল পরিচয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু। একসময় ব্রাজিলের সাও পাওলো বা আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসকে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরির প্রধান কারখানা বলা হতো। এখন সেই বিশ্বস্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় ল্যাটিন আমেরিকাকে টেক্কা দিয়ে সবার ওপরে উঠে এসেছে প্যারিসের নাম। এই ফরাসি শহরের চারপাশে এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লাব ও একাডেমি। হাজারো তরুণ প্রতিদিন সেখানে পেশাদার ফুটবল শিখছে, যাদের একটি বড় অংশই অভিবাসী পরিবারের সন্তান। বয়স বাড়লে কেউ ফ্রান্সকে বেছে নেয়, কেউবা ফুটবলীয় টানে ফিরে যায় নিজের আদি শিকড়ে।

এই দ্বৈত পরিচয়ই আধুনিক ফুটবলে এক নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে একই শহরে জন্ম নেওয়া দুই বন্ধু খেলছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুই ভিন্ন দেশের হয়ে। আর প্যারিসের লা শাপেলের মতো এলাকাগুলোতে সেই দ্বৈততা কোনো বিভাজন বা সংঘাত তৈরি করে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক অনন্য উদযাপনের অংশ। একই শহরে দুই মহাদেশের আত্মার এমন মেলবন্ধনের উদাহরণ লা শাপেলের চেয়ে সুন্দর আর কোথায়ই বা মিলবে!

মন্তব্য করুন