শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ প্রতিষ্ঠানে চীনের নিষেধাজ্ঞা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অব্যাহত শুল্ক আরোপ ও চীনা সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করার কঠিন জবাব দিয়েছে চীন। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেইজিং। বুধবার চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে জানানো হয়, এখন থেকে চীনের কোনো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তালিকাভুক্ত এই মার্কিন ফার্মগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন, ব্যবসা বা সহযোগী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত হাই-প্রোফাইল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা রয়েছে। সেই শীর্ষ বৈঠকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দুই দেশের এই নতুন বাণিজ্য যুদ্ধ উত্তেজনাকে এক অভূতপূর্ব মাত্রায় নিয়ে গেল।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অন্যায় ও আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এক ধরনের ‘জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে এই কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা পাওয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশেষায়িত বায়োটেক ফার্ম, ডেটা ও রিসোর্স অ্যানালিটিক্স কোম্পানি রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রগামী সব ধরনের সামরিক ও বাণিজ্যিক ড্রোন, ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নিয়মেও ব্যাপক কড়াকড়ি এনেছে বেইজিং।
উল্লেখ্য, উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে গত সপ্তাহে ৪৩টি চীনা কোম্পানির পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওয়াশিংটন। তারই সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ৬টি কোম্পানিকে তাদের প্রতিরোধমূলক কালো তালিকায় যুক্ত করেছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা সপ্তম মার্কিন কোম্পানিটির বিষয়ে জানা গেছে, সেটি মূলত মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি)-র সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে গত মাসে মার্কিন এফসিসি চীন থেকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মানবিক রোবট (Humanoid Robots) ও চার পায়ে হাঁটা রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ড্রোন ও রোবোটিক্স প্রযুক্তির ওপর কড়াকড়ি ছাড়াও চীন আরও কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ শুরু করেছে। দেশটির সরকারি দপ্তরে ব্যবহৃত মার্কিন ও অন্যান্য বিদেশজাত সফটওয়্যারযুক্ত ডিভাইসের ওপর কঠোর নিরাপত্তা তদন্ত শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানায় যৌথ উৎপাদন ও পণ্যের ট্র্যাকিং নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ পরিদর্শন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে বেইজিং।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানান, একের পর এক চীনা ফার্মকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পর বেইজিংয়ের হাতে কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে তাদের ভুল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট সব অন্যায় পদক্ষেপ প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি। একটি স্থিতিশীল ও গঠনমূলক চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধরে রাখতে ওয়াশিংটনকে ইতিবাচক বার্তা দিতে হবে।”
একই সঙ্গে মুখপাত্র কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের কথা না শুনে চীনের স্বার্থবিরোধী কোনো নতুন বিধিনিষেধ আরোপে জেদ ধরে, তবে চীন এরচেয়েও বহুগুণ কঠিন ও অভূতপূর্ব পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”
প্রসঙ্গত, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে পণ্য তৈরির অভিযোগ তুলে চীনা ফার্মগুলোকে বারবার কালো তালিকাভুক্ত করা, নতুন প্রযুক্তির রোবট ও পাওয়ার কনভার্টার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি বেশ আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। ইরানি অপরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনের অভিযোগে একাধিক চীনা শিপিং অপারেটরকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি চীনের শীর্ষস্থানীয় দুটি বেসামরিক বিশ্ববিদ্যালয়কে পেন্টাগনের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ওয়াশিংটন।
এর আগে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে চীনসহ কয়েকটি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় চীনা এআই (AI) ফার্মা ও গবেষণাগারের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে মার্কিন কর্তারা।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে বিশ্ব অর্থনীতিকে চালিকাশক্তি দেওয়া দুটি প্রধান দেশের মধ্যকার লড়াই এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার পেছনে মূলত কাজ করছে এক চরম ‘অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ঠান্ডা যুদ্ধ’, যেখানে দুই পরাশক্তিই নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পাল্টা চাল দিয়ে যাচ্ছে।
|