আদিবাসীদের ঐতিহ্য থেকে বৈশ্বিক ট্রেন্ড: রুইবোস চায়ের বিশ্বজয়ের গল্প
অনলাইন ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকার সিডারবার্গ পর্বতমালার পাথুরে উপত্যকার বিশেষ আবহাওয়া ও উর্বর ভূখণ্ডে কেবল প্রাকৃতিক নিয়মে জন্মায় ‘রুইবোস’ (Rooibos) নামক এক বিশেষ উদ্ভিদ। দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগত ঔষধি পানীয় হিসেবে এই পাতা ব্যবহার করে আসলেও, আফ্রিকানদের প্রিয় এই ‘রেড বুশ’ (Red Bush) পানীয়টি আজ ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে এক নতুন আভিজাত্য অর্জন করেছে। অনন্য স্বাদ ও অতুলনীয় ভেষজ গুণাবলির কারণে বর্তমানে বিশ্ববাজারে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার এই ঐতিহ্যবাহী চায়ের চাহিদা।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে রুইবোস চায়ের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রেকর্ড পরিমাণ চা রপ্তানি হয়েছে। এটি প্রাকৃতিকভাবে শতভাগ ক্যাফেইনমুক্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কফি ও সাধারণ প্রক্রিয়াজাত কালো চায়ের স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে সচেতন মানুষের তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো ও ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধির সম্ভাবনা দূর করার মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এতে রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে, বিশেষ করে জাপানে এই চায়ের চাহিদা এখন তুঙ্গে। সেখানে সাধারণ পানীয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন নামীদামি প্রসাধন সামগ্রীতে উপাদান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে আজকের এই আন্তর্জাতিক সাফল্য ও জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ ও তিক্ত সংগ্রামের ইতিহাস। স্থানীয় ‘সান’ ও ‘খোই’ আদিবাসীদের হাজার বছরের ঐতিহ্যগত জ্ঞান থেকে উদ্ভূত এই চায়ের ব্যবসা একটা সময় পর্যন্ত পুরোপুরি বর্ণবাদী শাসক ও প্রভাবশালী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে এক ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে রুইবোস ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর বাৎসরিক লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ এসব আদিবাসী সম্প্রদায়ের কল্যাণ তহবিলে প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। শুধু তা-ই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ফরাসি শ্যাম্পেন বা ইতালীয় গোরগনজোলা চিজের মতো ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা প্রদান করে রুইবোসকে ‘প্রোটেক্টেড ডেজিগনেশন অব অরিজিন’ (PDO) হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এই শিল্পের সামনে নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আফ্রিকার পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ খরার কারণে অনেক সময় এই চায়ের উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সাধারণ সবুজ বা কালো চায়ের মতো গুদামজাত করার পর রুইবোসের গুণমান বা স্বাদ সহজে নষ্ট হয় না। ফলে চরম খরা বা কাঁচামালের ঘাটতির মধ্যেও এই চা তার গুণাগুণ বজায় রেখে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
|