মাদাগাস্কারে জ্যাম কমানোর ১৭ কোটি ডলারের ক্যাবল কার প্রকল্প থমকে গেল

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:১২ অপরাহ্ণ
মাদাগাস্কারে জ্যাম কমানোর ১৭ কোটি ডলারের ক্যাবল কার প্রকল্প থমকে গেল
মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর অচল ক্যাবল কার প্রকল্পের দৃশ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর চরম ও শ্বাসরুদ্ধকর ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে চালু করা ক্যাবল কার প্রকল্প শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ১৭ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে সাব-সাহারান আফ্রিকায় নির্মিত এই অনন্য ও ড্রামাটিক প্রকল্পটি যানজট কমানোর বদলে এখন বিশাল এক অর্থহীন ব্যর্থতায় রূপ নিয়ে শূন্যে ঝুলে রয়েছে।

মূলত রাজধানীর সরু সড়ক ও উপচে পড়া ট্রাফিক সৃষ্টিকারী মিনিবাস ট্যাক্সির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভৌগোলিক গঠন জলাভূমি হওয়ায় সেখানে লাইট রেল নির্মাণ অসম্ভব জেনে মাদাগাস্কারের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আন্দ্রি রাজোয়েলিনা এই ঝুলন্ত ক্যাবল কার চালুর উদ্যোগ নেন। একে তিনি ফ্রান্সে আইফেল টাওয়ার নির্মাণের মতো দেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মুহূর্ত বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

মাত্র ৩ লাখ মানুষের ধারণক্ষমতার শহর আন্তানানারিভোতে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ফ্রান্সের ঋণে তিন বছর ধরে নির্মিত এই আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা প্রতিদিন অন্তত ৭৫ হাজার যাত্রী বহন করবে এবং সড়ক থেকে একযোগে ২ হাজার যানবাহন কমাবে। ফলে নগরের ৩ ঘণ্টার দীর্ঘ যাতায়াত মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিটে নেমে আসবে।

তবে চালুর পরই প্রকল্পের মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় টিকিটের অতিরিক্ত ও অন্যায্য মূল্য। প্রতি ট্রিপের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭০ থেকে ৯০ ইউএস সেন্ট, যা স্থানীয় প্রচলিত মিনিবাস ভাড়ার চেয়ে ছয় থেকে আট গুণ বেশি। অথচ বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে একজন সাধারণ কর্মচারীর গড় মাসিক বেতন মাত্র ৭২ ডলার এবং ৩০ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটির প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষই চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ পিটার ওন্ডারওয়াটার এ বিষয়ে জানান, দরিদ্র এই মহাদেশের মানুষের কাছে যাতায়াতের সময় বাঁচানোর চেয়ে অর্থ সাশ্রয় করা বহু গুণ বেশি জরুরি। ফলে সাধারণ মানুষ যানজটে আটকে থাকা মেনে নিলেও এত চড়া ভাড়ার ক্যাবল কারে চড়তে রাজি হয়নি। তা ছাড়া বহু বছর ধরে চরম বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভোগা স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের এমন অনাবশ্যক খরচে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শূন্যে মাঝপথে আটকে পড়ার তীব্র নিরাপত্তাশঙ্কাও তৈরি হয় মানুষের মধ্যে।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থানের সময় ক্ষুব্ধ জনতা প্রকল্পটির কয়েকটি স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসক কর্নেল মাইকেল রান্ড্রিয়ানিরিনার অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রকল্পের ব্যাপারে নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার নগর জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার পথে থাকলেও সেখানে মিনিবাসই সাধারণ মানুষের মূল ভরসা। ফলে কোটি কোটি ডলারের এই উচ্চাভিলাষী ক্যাবল কার প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসেনি।

মন্তব্য করুন