‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’: জিরো পয়েন্টে ১১ দলের কর্মসূচিতে উত্তপ্ত রাজপথ
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের অন্যায্য ও ‘ভূতুড়ে’ বিলের দাপট, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চড়া মূল্য এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদে রাজধানীতে এক ব্যতিক্রমী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। এ দিন বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারী কর্মীদের হাতে গ্যাসের খালি চুলা ও রান্নার পাতিল দেখা যায়, যা সাধারণ পথচারী ও উৎসুক জনতার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট, ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পল্টন জিরো পয়েন্টে এই অবস্থান কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কর্মসূচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও প্রতীকী প্ল্যাকার্ড নিয়ে জিরো পয়েন্ট এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করে তারা রাজপথে নানা ধরনের প্রতিবাদী স্লোগান দেন। ফলে পল্টন, গুলিস্তান ও এর আশপাশের ব্যস্ত সড়কে বেশ কিছুক্ষণ তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
রাজপথের এই অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিরাজমান চরম বিশৃঙ্খলা ও সংকট নিরসনে ১০ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করে জোটটি। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিগত তিন মাসে আদায় করা তথাকথিত ‘ভূতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে অবিলম্বে স্বচ্ছ গণশুনানির আয়োজন করতে হবে, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ গ্রাহকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
এছাড়া প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং নানা ধরনের বাড়তি ফি অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানানো হয়। অতীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ পরবর্তী বিলে পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়া এবং পুরো বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থার মধ্যে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে উপস্থিত জোটের শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ থাকবে না, সেখান থেকে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল আদায় করা যাবে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন জোরদার করা, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় টেকসই নীতি প্রণয়ন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং দ্রুততম সময়ে নতুন কূপ খননের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানান তাঁরা। পাশাপাশি মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের সার্বিক কার্যক্রমে বারবার ব্যর্থতার সঠিক তদন্ত করা, সার্বিক ক্ষতির হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা, পুনরায় চালুর সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা এবং আপদকালীন বিকল্প জ্বালানি সরবরাহে কার্যকর মহাপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানায় জোটটি।
১০ দফা দাবিনামায় আরও জোর দিয়ে বলা হয়, গ্যাসের সিস্টেম লস, অবৈধ সংযোগ, চুরি ও অপচয় বন্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থা চালু, সব বেআইনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং পুরোনো জরাজীর্ণ পাইপলাইন দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্র থেকেই অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ সুনিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে জাতীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সচল রাখা এবং বাজারে পর্যাপ্ত এলপিজি (LPG) ও সিএনজির (CNG) সরবরাহ বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়।
সার্বিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাসা বেঁধে থাকা দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানান জোটনেতারা।
পল্টনের এই বৃহৎ অবস্থান কর্মসূচিতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র প্রকৌশলী রাশেদ প্রধানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ সারির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন।
|