উষ্ণ ভূমধ্যসাগরে সামুদ্রিক কচ্ছপের বংশবিস্তারে চরম ঝুঁকি
অনলাইন ডেস্ক: নিয়ন্ত্রণহীন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমশ চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জলভাগ ভূমধ্যসাগর। আর সাগরের এই অতিমাত্রায় উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সেখানে বসবাসকারী বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপের স্বাভাবিক জীবনচক্র এবং প্রজননব্যবস্থায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকার কারণে কচ্ছপের ডিম ফোটার পর জন্ম নেওয়া নতুন শাবকদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে স্ত্রী কচ্ছপের সংখ্যা বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুরুষ কচ্ছপের চরম সংকট তৈরি হবে, যা পুরো প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী নভেম্বরে তুরস্কে বিশ্ব জলবায়ুসংক্রান্ত শীর্ষ সম্মেলন ‘কপ৩১’ (COP31) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই কপ৩১ সম্মেলনের মূল প্রতীক বা অফিসিয়াল মাসকট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় লগারহেড প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপকে।
সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম থেকে আসা শাবকের লিঙ্গ নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করে ডিম পেড়ে রাখা সৈকতের বালুর সঠিক তাপমাত্রা। বৈজ্ঞানিক সূত্র অনুযায়ী, বাসায় ব্যবহৃত বালু অতিরিক্ত গরম হলে তা থেকে বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রী কচ্ছপের জন্ম হয়।
তুরস্কের ইজতুজু ও পাতারা সৈকতে গবেষণা চালানো বিখ্যাত পামুক্কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল জানান, গত দুই দশকে কচ্ছপের প্রজননস্থলের বালুর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, পাতারা সৈকতে জন্ম নেওয়া মোট লগারহেড কচ্ছপের প্রায় ৭০ শতাংশই স্ত্রী শাবক। গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রজনন বাসায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলে কচ্ছপের ডিমের ভেতরের ভ্রূণ মারা যায়।
কেবলমাত্র তাপমাত্রা বৃদ্ধিই নয়, সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজাতির জন্য দ্বিতীয় বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রে ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার ট্রলারের শক্তিশালী জাল।
তুরস্কের ইজতুজু সৈকতের ‘ডেকামার পুনর্বাসনকেন্দ্রে’ চিকিৎসাধীন কচ্ছপগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশের পেটে অত্যন্ত ক্ষতিকর অনু-প্লাস্টিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাছাড়া মাছ ধরার বাণিজ্যিক জালে আটকা পড়ে পানির ওপর উঠে সময়মতো শ্বাস নিতে না পেরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অগণিত কচ্ছপ পানিতেই মারা পড়ছে।
সামুদ্রিক পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, কচ্ছপের জীবনচক্রে এই আকস্মিক বিপর্যয় কেবল একটি একক প্রাণীর সংকট নয়; বরং এটি পুরো সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) ধ্বংস হওয়ার এক ভয়াবহ প্রাথমিক পূর্বাভাস।
যেহেতু সামুদ্রিক কচ্ছপ এক দেশের সমুদ্র সৈকতে ডিম পাড়ার পর খাদ্যের খোঁজে অন্য দেশের আন্তর্জাতিক জলসীমায় পাড়ি জমায়, তাই এদের অস্তিত্ব রক্ষায় শুধু একক কোনো দেশ নয়—বরং পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সমন্বিত উদ্ধার পরিকল্পনা, প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস এবং সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।