গড় আয়ুতে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশ: রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৮ অপরাহ্ণ
গড় আয়ুতে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক: স্বাস্থ্যসেবা প্রসার, কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি এবং শিশু মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিক সাফল্যের ওপর ভর করে বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানেও এখন এই বিশাল অগ্রগতির ছবি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে জন্মের সময় একজন মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৭২ দশমিক ৭ বছর। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৭১ বছর এবং পাকিস্তানে ছিল ৬৮ দশমিক ২ বছর। ফলে গড় আয়ুর আন্তর্জাতিক সূচকে নিকট দুই প্রতিবেশীকে স্পষ্ট ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

অবশ্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয়ুর এই পরিসংখ্যান এখনো বেশ পিছিয়ে। ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু ছিল ৭৮ দশমিক ৫ বছর এবং কানাডায় তা ৮১ দশমিক ৪ বছর রেকর্ড করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রাক্কলন (Global Health Estimates) শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গড় আয়ু, সুস্থ অবস্থায় বাঁচার প্রত্যাশিত মেয়াদ এবং মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, করোনাভাইরাস মহামারির বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী অভিঘাত কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গড় আয়ু মহামারি-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে শুরু করলেও শারীরিক সুস্থতা নিয়ে বেশিদিন বেঁচে থাকার সূচকটিতে অগ্রগতি হচ্ছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।

কয়েক দশকে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশের ছবি

বাংলাদেশের এই প্রশংসনীয় অবস্থানকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে কয়েক দশক পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। ১৯৭৯ সালে দেশে যখন জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি ছিল মারাত্মক নাজুক। সেই সময়ে প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মগ্রহণকারী শিশুর মধ্যে ২১১ জন শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন দেখার আগেই প্রাণ হারাত।

স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র আট বছরের মাথায় ব্যাপক দারিদ্র্য, সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ এবং চিকিৎসক ও নার্সের চরম সংকট বাংলাদেশকে গ্রাস করে রেখেছিল। সেই সময় একজন সাধারণ বাংলাদেশির গড় আয়ুসীমা ছিল মাত্র ৪৭ বছর।

তবে সময় ও সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলে চিত্রনাট্য বদলে গেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারের জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রতি ১ হাজারে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৩১ জনে নেমে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান গড় আয়ু ৭৩ দশমিক ৭ বছর বলেও উলেখে রয়েছে। টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসার সহজলভ্যতা এই অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

দীর্ঘ জীবনের পাশাপাশি প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা

যদিও গড় আয়ুর বৃদ্ধি একটি জাতির জনস্বাস্থ্যের সার্বিক মান নির্দেশ করে, তবুও দীর্ঘ জীবন লাভ করার অর্থই যে জীবনের সব কটি বছর ব্যধিহীন ও কর্মক্ষম থাকছে—তা নয়। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে গড় আয়ু ও সুস্থ জীবনকালের মধ্যে বিদ্যমান ফারাকটি পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে।

যেমন ভারতের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে গড় আয়ু ৭১ বছর হলেও সেখানকার মানুষের সুস্থ অবস্থায় বেঁচে থাকার গড় মেয়াদ ছিল মাত্র ৬০ দশমিক ৬ বছর। ২০১৯ সালে এই সুস্থতার মেয়াদ ছিল ৬০ দশমিক ৫ বছর, যা ২০২১ সালের করোনা সংকটে কমে ৫৮ দশমিক ৪ বছরে নেমে যায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তা ৬০ দশমিক ২ বছর এবং ২০২৩ সালে ৬০ দশমিক ৬ বছরে উন্নীত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বৈশ্বিক সংকটের ধকল সামলে গড়ে তারা ২ দশমিক ৯ বছরের গড় আয়ু পুনর্দখল করলেও সুস্থতার মেয়াদ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ২ বছর।

মহামারি-পরবর্তী বৈশ্বিক চিত্র

ডব্লিউএইচওর সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৩ বছরে, যা ২০১৯ সালের প্রাক-করোনা পরিসংখ্যানের (৭৩ দশমিক ৪ বছর) প্রায় সমান। অর্থাৎ গোটা বিশ্ব মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে আগের গড় আয়ুর কাছাকাছি ফিরলেও মানুষের স্বাস্থ্যবান থাকার সময়কাল পুনরুদ্ধার করার গতি তুলনামূলক শ্লথ।

সংস্থাটির ডেটা ও গ্লোবাল অ্যানালিটিক্স বিভাগের প্রধান অ্যালাইন ল্যাবরিক মন্তব্য করেন, "জনস্বাস্থ্যের মানদণ্ডে মানুষের গড় আয়ু বাড়ানো একটি অভাবনীয় সফলতা। তবে সামনের দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বাড়তি বয়সের সেই দিনগুলো মানুষ যেন পূর্ণ শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থতা নিয়ে অতিবাহিত করতে পারে।"

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, কৌশলগত রূপরেখা ও সঠিক সামাজিক বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রত্যাশিত শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং গড় আয়ু বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। সাফল্য উদযাপনের পর বাংলাদেশের সামনের প্রধান সামাজিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃদ্ধি পাওয়া এই আয়ুষ্কালকে ব্যাধিমুক্ত, গতিশীল ও কর্মক্ষম করে তোলার সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।