আন্তর্জাতিক চা দিবস আজ: চুমুকে চুমুকে সুখের দিন
চায়ের ইতিহাস কিন্তু আজকালের নয়, এটি প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২৭ অব্দে চীনের তৎকালীন সম্রাট শেন নুং-এর রাজপ্রাসাদে একদিন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। রাজপ্রাসাদের বাগানে সম্রাটের জন্য রাখা গরম পানির পাত্রে বাতাসে উড়ে এসে কিছু বুনো গাছের পাতার টুকরো পড়ে। সম্রাট কৌতূহলবশত সেই পাতা মিশ্রিত পানি পান করেন এবং এক অদ্ভুত সুন্দর স্বাদ ও শরীরে নতুন শক্তির সন্ধান পান। মূলত সেখান থেকেই চায়ের উৎপত্তি।
শুরুর দিকে চা কেবল চিকিৎসাগুণ সম্পন্ন ভেষজ বা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, পরবর্তীতে তা রাজকীয় ও অভিজাত পানীয়তে রূপ নেয়। এরপর ১৬ শতকের দিকে পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে চা এশিয়া মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ১৭ শতকে এসে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক হাত ধরে এটি বিশ্বজুড়ে এক বৈপ্লবিক ও জনপ্রিয় পানীয় হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক চা দিবস উদযাপনের পেছনের গল্পটা কিন্তু কেবলই আনন্দের নয়; এর পেছনে রয়েছে বিশ্বায়নের যুগে বড় বড় করপোরেট কোম্পানির শোষণের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকদের এক ঐতিহাসিক ও রক্তাক্ত লড়াইয়ের ইতিহাস। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’ (ডব্লিউএসএফ)। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনের এই মিলনমেলায় অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার মতো বিশ্বের বড় বড় চা উৎপাদনকারী দেশের ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা।
ওই সময় বিশ্ববাজারে চায়ের দাম হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো লোকসান ঠেকাতে চা বাগান বন্ধ করে দিচ্ছিল এবং শ্রমিকদের ছাঁটাইসহ দৈনিক মজুরি অমানুষিকভাবে কমিয়ে দিচ্ছিল। এই চরম সংকটের মুখে মুম্বাইয়ের ওই ফোরামে চা শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা চলায় উঠে আসে যে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যে চা পান করে তৃপ্তি পাচ্ছেন, তার নেপথ্যে থাকা লাখ লাখ চা শ্রমিক চরম দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং মৌলিক অধিকারহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এই করুণ বাস্তবতার দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে এবং করপোরেট শোষণের বিরুদ্ধে একজোট হতে ভারতের ‘নিখিল ভারতীয় চা শ্রমিক ফেডারেশন’ এবং শ্রীলঙ্কার শ্রমিক নেতারা প্রথম প্রস্তাব করেন—বিশ্বের একটি নির্দিষ্ট দিনকে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক, যা হবে মূলত চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন।
মুম্বাই ফোরামের সেই ঐতিহাসিক দাবির পর, ২০০Process বা ২০০৫ সালে দিল্লির এক আন্তঃদেশীয় সম্মেলনে চা উৎপাদনকারী দেশগুলো একত্রিত হয়ে ১৫ ডিসেম্বর দিনটিকে প্রথম বেসরকারিভাবে চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই নির্দিষ্ট দিনটি বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিবাদী ঘটনা। ১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমেরিকার বোস্টন বন্দরে ব্রিটিশদের অন্যায় ও অতিরিক্ত চা করের প্রতিবাদে ‘সানস অব লিবার্টি’ আন্দোলনের কর্মীরা প্রায় ৩৪০টি চায়ের বাক্স সাগরে ফেলে দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে ‘বোস্টন টি পার্টি’ নামে পরিচিত। এই চা বিদ্রোহের ঘটনাটিকে এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক চা বাণিজ্য ও শ্রমিকদের অধিকারের লড়াইকে প্রতীকী রূপ দিতেই শুরুতে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে, সাধারণত অধিকাংশ এশীয় ও আফ্রিকান চা উৎপাদনকারী দেশে মে মাস থেকেই চায়ের নতুন মৌসুম বা মূল উৎপাদন শুরু হয়, যখন চায়ের পাতা সবচেয়ে সতেজ ও গুণগত মানের থাকে। নতুন মৌসুমের শুরুতেই যেন বিশ্ববাজার চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিয়ে সচেতন হতে পারে, সেজন্যই জাতিসংঘ ২০১৯ সালে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ‘২১ মে’ তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এরপর থেকে প্রতি বছর বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সরকারিভাবে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করছে বাংলাদেশ চা বোর্ড।
পানির পর বিশ্বজুড়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে পানীয়টি পান করে, তা হলো চা। এটি শুধু একটি সস্তা ও সহজলভ্য পানীয়ই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিশ্বজুড়ে চা চাষের সাথে লাখ লাখ প্রান্তিক চাষি ও শ্রমিক সরাসরি জড়িত, যাদের একটি বড় অংশই অবহেলিত নারী শ্রমিক।
আজকের এই বিশেষ দিনে পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা একটি বড় বিপদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে, তাতে চায়ের উৎপাদন ও গুণগত মান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তাই আমাদের প্রতিদিনের প্রশান্তির চুমুক ধরে রাখতে এবং এই শিল্পের সাথে জড়িত কোটি শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে চা বাগানগুলোর সুরক্ষায় এখনই বৈশ্বিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জান্নাত সকালাবেলা
|