ইতিহাস গড়া ‘জুলাই বিপ্লবের’ দ্বিতীয় বার্ষিকী আজ

প্রকাশ: বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ অপরাহ্ণ
ইতিহাস গড়া ‘জুলাই বিপ্লবের’ দ্বিতীয় বার্ষিকী আজ

অনলাইন ডেস্ক ঃ আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়—‘জুলাই বিপ্লব’ বা ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। ২০২৪ সালের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে থেকে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা-ই পরবর্তীতে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশকে মুক্ত বাতাস উপহার দেয়। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা সেই ‘৩৬ জুলাইয়ের’ সূচনা হয়েছিল আজকের এই দিনেই।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা আওয়ামীলীগের নির্মম দমন-পীড়নের মুখে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকা শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

আন্দোলনের পটভূমি: ২০১৮ থেকে ২০২৪

এই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হয়েছিল মূলত ২০১৮ সালে। সেই সময় ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সরকারের ওই পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করলে আবারও ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়।

আদালতের এই রায়ের পর নতুন করে ফুঁসে ওঠেন দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ২০২৪ সালের জুন মাসজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছোট ছোট বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হতে থাকে। ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো নির্বাহী আদেশ না আসায় শিক্ষার্থীরা চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন।

১ জুলাই: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর আত্মপ্রকাশ ও স্ফুলিঙ্গ

২০২৪ সালের ১ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আত্মপ্রকাশ করে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম। এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী জমায়েত হন। সেখান থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তাঁরা টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সমাবেশ করেন।

সমাবেশ থেকে ৪ জুলাইয়ের মধ্যে আইনিভাবে দাবির চূড়ান্ত সুরাহার আলটিমেটাম দিয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। সেই সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের হল ও গ্রন্থাগারসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে অনতিবিলম্বে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে।

একই দিন ঢাকার বাইরেও আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টায় শহীদ মিনারের পাদদেশে সমাবেশ শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১০ মিনিটের একটি প্রতীকী অবরোধ তৈরি করেন এবং দাবি আদায় না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য মহাসড়ক অচল করার হুঁশিয়ারি দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরাও তাঁদের বিখ্যাত ‘প্যারিস রোডে’ টানা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরাও দুপুরে জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে সমবেত হয়ে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখা এবং পরবর্তীতে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে থাকা অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা স্থায়ীভাবে বিলোপ করা।

শান্তিপূর্ণ উপায়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার সর্বশক্তি দিয়ে দমনের পথ বেছে নিলে ১৫ জুলাই থেকে দেশজুড়ে সহিংসতা এবং ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী প্রাণহানি। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকরাও রাস্তায় নেমে আসেন, যা শেষ পর্যন্ত একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বুকে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দেয়।

মন্তব্য করুন