সেলুনের আড়ালে অটো চুরির সাম্রাজ্য, কোটিপতি সাবেক নাপিত

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ণ
সেলুনের আড়ালে অটো চুরির সাম্রাজ্য, কোটিপতি সাবেক নাপিত

রেজাউল করিম মজুমদার, গাজীপুর: গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস এলাকা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই এলাকায় আশরাফুল আলম নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী চোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক অটোরিকশা চুরি এবং কোটি টাকা কামানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

একসময় পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ সেলুন নাপিত। দিনশেষে সামান্য আয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। তবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, একাধিক আলিশান বাড়ি ও গাড়ির মালিক।

আশরাফুল আলম দিনের বেলা একটি সেলুনে নাপিতের কাজ করতেন এবং রাতে তাঁর চোর চক্র পরিচালনা করতেন। তিনি একা নন, তাঁর অধীনে প্রায় ১৫-২০ জনের একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করত। তাদের চুরির কৌশলগুলো ছিল অত্যন্ত চতুর।

চক্রের সদস্যরা যাত্রী সেজে অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে অটোরিকশা ভাড়া করত। সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে চালককে মালামাল নামাতে সাহায্য করতে বলে গাড়ি থেকে দূরে সরিয়ে দিত। চালক সরতেই চক্রের অন্য সদস্যরা মাস্টার কী (নকল চাবি) দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অটোরিকশা নিয়ে চম্পট দিত।

চুরি করা অটোরিকশাগুলো দ্রুত ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত গ্যারেজে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে গাড়ির রং এবং পার্টস পরিবর্তন করে ভুয়া লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর বসানো হতো।

এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের পেছনে কোনো আলাদিনের চেরাগ ছিল না, ছিল একটি সুসংগঠিত অটোরিকশা চোর চক্রের নেতৃত্ব।

সম্প্রতি একাধিক অটোরিকশা চালক জানান, উত্তরা থেকে চুরি হওয়া অটোরিকশাগুলো গাজীপুর বাইপাসে এনে কম টাকায় বিক্রি করা হয়। অটোরিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও পার্টস উলটপালট করে রাতারাতি গাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয় অন্য কোনো অজানা প্রান্তে। শেরপুরে তাঁর স্থায়ী বাড়ি, সেখানে কয়েক বছরের ব্যবধানে ৩৫ থেকে ৪০টি অটোরিকশা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর নেতৃত্বে তা চলে। চুরির টাকা দিয়ে তিনি একাধিক জমি ক্রয় করেছেন এবং শেরপুরে ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

চালকেরা আরও জানান, বিভিন্ন ট্রাফিক পুলিশের সাথে লিয়াজোঁ করে অটোরিকশা মান্থলি দিয়ে চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নামমাত্র অটোরিকশা গ্যারেজের আড়ালে তাঁর সুদের ব্যবসাও রয়েছে, যেখানে ৫ হাজার টাকা দিয়ে কয়েক মাসের ব্যবধানে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, গত ৫ বছরে এই চক্রটি প্রায় ৪০০-এর বেশি অটোরিকশা ও ইজিবাইক চুরি করে বিক্রি করেছে। প্রতি অটোরিকশা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই চোরাই টাকা দিয়ে নিজ এলাকায় ফাউন্ডেশন দিয়ে একটি রাজকীয় বাড়ি তৈরির অভিযোগও রয়েছে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে উঠে এসেছে, গাজীপুরের বাইপাসে তাঁর অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বাসন থানায় অটোরিকশা চুরির দুটি মামলাও রয়েছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ প্রশাসন।

চুরি হওয়া অটোরিকশার মালিক ও চালকেরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অধিকাংশ চালকই কিস্তিতে টাকা তুলে বা ধারদেনা করে এই গাড়িগুলো কেনেন। গাজীপুরের একজন ভুক্তভোগী গ্যারেজ মালিক জানান, তাঁর গ্যারেজ থেকে গাড়ি চুরি হওয়ার পর উল্টো চোর চক্র তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে এবং মামলা করায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অটোরিকশা চুরি রোধে গ্যারেজগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং চালকদের সচেতন হওয়া জরুরি। গ্যারেজগুলোতে রাতে পাহারার ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি কোনো অপরিচিত ব্যক্তি কম দামে অটোরিকশা বা পার্টস বিক্রি করতে এলে তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চোর সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা আশরাফুল আলম বলেন, "আমি দিন আনি দিন খাই, আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা। আমার যা শেষ হওয়ার আগেই হয়ে গেছে।"

বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশিদ জানান, "রিকশা চুরি করে যারা সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির ওপর আঘাত হানছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।" চুরি হওয়া রিকশা উদ্ধারে এবং জড়িত চোর চক্রকে নির্মূল করতে পুলিশের এই চিরুনি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন