খাল না কেটে ফিরে এলেন বাগেরহাটের এমপি

প্রকাশ: শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩১ অপরাহ্ণ
খাল না কেটে ফিরে এলেন বাগেরহাটের এমপি

বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ‘দেলভাষানি খাল’ দখলমুক্ত করতে গিয়ে স্থানীয় দখলদারদের প্রবল বাধার মুখে পড়েছে জেলা প্রশাসন। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন ধরে খালটিতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করে আসা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আর্থিক ক্ষতির দোহাই দিলে, মানবিক ও কৌশলগত কারণে তাঁদের মাছ তুলে নেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ এবং জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।

আজ শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের গোমতি এলাকায় দেলভাষানি খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও খনন অভিযান শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ লক্ষ্যে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ মোসা. আতিয়া খাতুনসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক উপস্থিত হন।

অভিযানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর আগেই সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিম কাজীর নেতৃত্বে কয়েকজন দখলদার এসে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঘেরাও করেন এবং খাল না কাটার জন্য জোর অনুরোধ জানান। এর কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ ও জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন পৌঁছালে তাঁদের কাছেও একই দাবি নিয়ে চড়াও হন দখলদাররা।

দখলদারদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি এই খাল আটকে মাছ চাষে তাঁদের ৫ লাখ টাকারও বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই মুহূর্তে বাঁধ কেটে দিলে মাছ ভেসে যাবে এবং তারা বড় ধরনের আর্থিক দেউলিয়ার মুখে পড়বেন।

দখলদাররা বাধা দিলেও খালের পাড়ে জড়ো হওয়া সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকের কাছে অনতিবিলম্বে খালটি দখলমুক্ত করার জোর দাবি জানান। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা সরকারি খালটি অবৈধভাবে গিলে খেয়ে মাছ চাষ করার কারণে এলাকার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে ভরা বর্ষা মৌসুম, এখন খাল উন্মুক্ত না করলে পুরো এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে।”

তবে প্রশাসন সাধারণ মানুষের দাবির চেয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে দখলদারদের ১৫ দিনের সময় দেয়। এ সময়ের মধ্যে সমস্ত মাছ তুলে নিয়ে খাল ফাঁকা করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। এদিকে বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিম কাজী নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে দাবি করেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে খাল দখল করিনি। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও দলীয় কিছু লোকজন এই খালটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভোগদখল করছে।”

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “জেলা প্রশাসনের তিন বছর মেয়াদি বিশেষ কর্মপরিকল্পনার আওতায় জেলার সমস্ত প্রাকৃতিক জলাধার ও মৃতপ্রায় খাল উন্মুক্ত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য কৃষকদের সেচের পানি নিশ্চিত করা এবং জলসম্পদ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা।” তিনি আরও যোগ করেন, “আজকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং কৌশলগত কারণে দেলভাষানি খালের ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মহরত দেওয়া হয়েছে। এই নির্ধারিত সময় পার হওয়া মাত্রই আইন অনুযায়ী কঠোর উচ্ছেদ চালানো হবে।”

বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, “খাল খনন ও অবৈধ উচ্ছেদ সরকারের একটি নিয়মিত ও চলমান কর্মসূচি। ইতিমধ্যেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে সরকারি খাল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এখানে একটি পক্ষ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তাই মানবিক কারণে তাদের ১৫ দিন সময় দেওয়া হলো। তবে সময় শেষ হলে কোনো অজুহাত খাটবে না, খাল সম্পূর্ণ মুক্ত করা হবে।”

উল্লেখ্য, বাগেরহাট জেলার ৭৫টি ইউনিয়নে ছোট-বড় কয়েকশ সরকারি খাল এভাবে প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে দখল করে মাছ চাষ করছে। ফলে জেলার কৃষি, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন