জামালপুরে দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা
জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরে ভুল চিকিৎসায় এক সরকারি কর্মকর্তার জীবন সংকটাপন্ন করার অভিযোগে বেসরকারি এম এ রশিদ হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী রোগী সাবেরী শারমিনের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর অনুমতি ছাড়াই জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অংশবিশেষ কেটে ফেলা হয়। পরবর্তীতে মারাত্মক সংক্রমণসহ নানা জটিলতার কারণে তাঁকে দেশ ও দেশের বাইরে নিয়ে আরও তিনবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। এতে তাঁর চিকিৎসার পেছনে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) জামালপুর আমলী আদালতে মামলাটি দায়ের করেন সাবেরী শারমিন। অভিযুক্ত দুই চিকিৎসক হলেন এম এ রশিদ হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডা. সাবরিনা বরকত ও জেনারেল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে জামালপুরের সিভিল সার্জনকে তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী তারিখে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদী সাবেরী শারমিন জামালপুর শহরের পূর্ব নয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং জামালপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি তলপেটে ব্যথা নিয়ে তিনি জামালপুরের এম এ রশিদ হাসপাতালে ভর্তি হন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর ডিম্বনালি ও ডিম্বাশয়ের চারপাশে সংক্রমণ এবং ডান পাশের ডিম্বাশয়ে রক্তভর্তি সিস্ট রয়েছে বলে জানানো হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ২৯ জানুয়ারি ডা. সাবরিনা বরকত ও ডা. মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় রোগী বা তাঁর স্বজনদের কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়েই জরায়ু ও ডিম্বাশয় কেটে ফেলা হয়। তবে সেগুলো সম্পূর্ণ অপসারণ না করায় কিছু অংশ ভেতরে থেকে যায়, যার ফলে তীব্র সংক্রমণ ও শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।
পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করে সংক্রমিত তরল ও পুঁজ বের করা হয়। এ সময় প্রথম অস্ত্রোপচারের ত্রুটির বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কিন্তু সংক্রমণ সম্পূর্ণ দূর না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গত ২৩ মার্চ তৃতীয় দফায় এবং ২০ জুন চতুর্থ দফায় আরও দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়।
ভুক্তভোগী সাবেরী শারমিন বলেন, "একটি ভুল অপারেশনের কারণে আমাকে চারটি অপারেশন সহ্য করতে হয়েছে। তাই আমি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। এম এ রশিদ হাসপাতালে অপারেশনের জন্যই ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল, কিন্তু সব মিলিয়ে আমার প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।"
তাঁর স্বামী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুক হোসাইন বলেন, "হাসপাতালের বাইরের চাকচিক্য দেখে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসকদের এমন মারাত্মক ভুলের কারণে আমাদের পুরো পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসিন আরাফাত জানান, ভুল চিকিৎসার অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি জামালপুর আমলী আদালতের বিচারক মোস্তাফিজুর রহমান গ্রহণ করে সিভিল সার্জনকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এম এ রশিদ হাসপাতালের সিনিয়র অ্যাডমিন ম্যানেজার ছিব্বির আহম্মেদের মুঠোফোনে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বাইরে আছেন বলে জানান। এ সময় অভিযুক্ত চিকিৎসকদের যোগাযোগের নম্বর চাইলে তিনি পরদিন কল দেবেন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, "গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যার পর আমরা আদালতের আদেশ হাতে পেয়েছি। আদালত স্বাস্থ্য বিভাগকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবো।"
এআইএল/সকালবেলা