শীতকালে মুমিনের বিশেষ ১০ আমল
ইসলামী জীবন ডেস্কঃ শীতকাল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য একটি বিশেষ ও অনন্য নেয়ামত। এ ঋতু যেমন প্রকৃতিকে এক নতুন রূপ ও প্রশান্তিতে সাজায়, তেমনি একজন মুমিনের জন্য ইবাদত-বন্দেগিতে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। শীতের দীর্ঘ রাত মুমিনকে তাহাজ্জুদ ও নফল ইবাদতের চমৎকার সুযোগ করে দেয়, আর ছোট দিনগুলো নফল রোজা রাখাকে তুলনামূলক সহজ করে তোলে।
শীতের কনকনে ঠান্ডায় অজু-গোসলের কষ্ট সহ্য করে ইবাদত করা, যথাসময়ে সালাত আদায় এবং অসহায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও রয়েছে অশেষ সওয়াব। তাই শীতের অলসতা ও আরামের মোহে ইবাদতে শৈথিল্য না দেখিয়ে এ ঋতুকে আত্মশুদ্ধি, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং মানবসেবায় কাজে লাগানো উচিত। শীতকালকে মুমিনের ইবাদতের বসন্তে পরিণত করতে পারে এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আমল নিচে তুলে ধরা হলো:
১. খাবারের আধিক্যের কারণে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা: শীতকালে প্রকৃতিতে প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি ও সুস্বাদু ফলমূল পাওয়া যায়। এটি মহান আল্লাহর অশেষ দান ও অনুগ্রহ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর...।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত: ২৪-৩২)।
২. শীতবস্ত্রের জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা: পোশাক আল্লাহর বিশেষ দান ও অনুগ্রহ। প্রচণ্ড শীত থেকে শরীরকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য আরামদায়ক শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করেছেন। তাই এই ঋতুতে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা আবশ্যক। কোরআনে এসেছে, ‘...আর আল্লাহ তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে...।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮১)।
৩. বেশি বেশি নফল রোজা রাখা: শীতকালে দিন খুবই ছোট হয় বিধায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা।” (তিরমিজি : ৭৯৫)। তাই সম্ভব হলে এই সময়ে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৪. শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো: ষড়ঋতুর বাংলাদেশে হাড়-কাঁপানো শীতে নাকাল হয়ে পড়ে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। শীতার্তসহ বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম মূল শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজনকে দাও তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও...।’ (সুরা : বানি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬)।
৫. শীতকালে বিশেষভাবে তাহাজ্জুদ আদায়: শীতকালে রাত অনেক লম্বা হওয়ায় শেষ রাতে খুব সহজেই তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা যায়। ঈমানদারদের গুণ বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায়...।’ (সুরা : সাজদাহ, আয়াত : ১৬)।
৬. অজু ও গোসলের ব্যাপারে সচেতন হওয়া: শীতকালে শরীর শুষ্ক থাকায় যথাযথভাবে ধৌত না হলে অজু-গোসল ঠিকমতো হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, অজুর সময় পায়ের গোড়ালি যেসব স্থানে পানি পৌঁছায়নি, সেগুলোর জন্য জাহান্নাম রয়েছে। তাই ভালোভাবে অজু করতে হবে। (মুসলিম : ৪৫৮)।
৭. মোজার ওপর মাসেহ করা: শীতের ঠান্ডায় অজুর সময় বারবার পা ধোয়া কষ্টকর হলে চামড়ার মোজা বা ওই জাতীয় মোজার ওপর শরীয়তসম্মত নিয়মে মাসেহ করার অবকাশ রয়েছে, যা মুকিমের জন্য এক দিন এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন পর্যন্ত বৈধ। (রদ্দুল মুহতার : ১/২৬০)।
৮. মুখ ঢেকে নামাজ না পড়া: নামাজে কোনো ওজর বা প্রয়োজন ছাড়া মুখ ঢেকে রাখা মাকরুহ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) সালাতের সময় মুখ ঢেকে রাখতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ : ৬৪৩)।
৯. শীতকালে জাহান্নাম থেকে বেশি বেশি মুক্তি চাওয়া: হাদিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শীত ও গ্রীষ্মের তীব্রতা মূলত জাহান্নামের নিঃশ্বাস থেকে আসে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কাজেই তোমরা গরমের তীব্রতা এবং শীতের তীব্রতা পেয়ে থাকো।” (বুখারি : ৩২৬০)। তাই তীব্র শীতে জাহান্নামের কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
১০. গাছের পাতা ঝরে পড়ার দৃশ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ: শীতে গাছপালার পাতা ঝরে যাওয়া মৃত্যুর ও আমল ঝরে যাওয়ার স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুল (সা.) একটি শুকনা পাতাবিশিষ্ট গাছের পাতা ঝরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, কোনো বান্দা জিকির করলে তার গুনাহ এভাবে ঝরে যায় যেভাবে এই গাছের পাতা ঝরে পড়ে। (তিরমিজি : ৩৫৩৩)।
সকালবেলা / নুসরাত