চাকরির আশায় দীর্ঘ শ্রম, নতুন নিয়োগে বাদ পড়ে বাগেরহাটে আন্দোলন
মাসুম বিল্লাহ (বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি): বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা নিয়োগবঞ্চিত অস্থায়ী কর্মচারীরা। চাকরির আশায় বছরের পর বছর নামমাত্র বেতন কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেও নতুন নিয়োগে স্থান না পাওয়ার অভিযোগ তাঁদের। কর্মসংস্থানের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের পাশে কেউ দাঁড়াননি বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে হাসপাতালের নিচতলা ও প্রধান ফটক এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আয়া, সুইপার, ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য পদে কর্মরত এসব অস্থায়ী কর্মী। এ সময় তারা ওয়ার্ড মাস্টারের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের সেবামূলক কাজে নিয়োজিত থাকার পরও নতুন নিয়োগে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।
আন্দোলনরত কর্মচারীদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মাত্র দুই হাজার টাকা মাসিক বেতনে কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে আসছেন।
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। সেই আশায় বছরের পর বছর হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের না জানিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আয়া, সুইপার, ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য পদে ২৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেও নিয়োগ না পাওয়া কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, হাসপাতালের জনবলসংকটের সময় তাঁরা রোগীদের সেবা, ওয়ার্ড পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাথরুম পরিষ্কারসহ বিভিন্ন সহায়ক কাজে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিনের শ্রম ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন নিয়োগে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত না করায় এখন পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, অন্তত হাসপাতালের অন্য কোনো কাজে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে প্রায় ৩০টি অসহায় পরিবারের জীবিকা নির্বাহের পথ তৈরি হবে।
আন্দোলনরত কর্মী বৃষ্টি বলেন, যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বাইরে হাসপাতালের আরও কিছু কাজে লোকের প্রয়োজন রয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাদের সেসব কাজে রাখার ব্যবস্থা করলে অন্তত ৩০টি অসহায় পরিবার বেঁচে থাকার অবলম্বন পাবে। আমরা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছি।
কর্মী লাবনী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাকরির আশায় তাঁরা হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে শ্রম দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিল, নতুন নিয়োগ হলে তাঁদের আগে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এবার নিয়োগের সময় তাদের কাউকেই নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের বাথরুম পরিষ্কার থেকে শুরু করে রোগীদের বিভিন্ন সেবামূলক কাজ তাঁরা করেছেন। এখন চাকরির ব্যবস্থা না হলে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।
কর্মী নাহিদা বলেন, ৫ আগস্টের পর হাসপাতালের জনবলসংকটের সময় তাঁরা কাজে যোগ দেন। তাঁর দাবি, প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করলেও তারা কোনো বেতন বা সুযোগ-সুবিধা পাননি। নতুন নিয়োগের আগে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা শুনেছিলেন তাঁরা। কিন্তু নতুন নিয়োগে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
কর্মী মাহমুদা সুলতানা মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্টের পর প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাঁরা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন। একমাত্র আশা ছিল, নতুন নিয়োগ হলে তাঁদের চাকরির ব্যবস্থা হবে। কিন্তু নিয়োগের খবর তাঁদের জানানো হয়নি। এখন চাকরি না হলে সন্তানদের নিয়ে পথে বসতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মী ফাতিমার অভিযোগ, নিয়োগের আগে তাঁরা পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তখন তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল এবং নতুন নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন কর্মীরা যোগ দেওয়ার খবর তারা পরে জানতে পারেন। আগে জানানো হলে তাঁরা অন্য কোথাও কাজের চেষ্টা করতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মী আয়সা অভিযোগ করেন, তিন বছর ধরে হাসপাতালে কাজ করেও তিনি আউটসোর্সিংয়ের চাকরি পাননি। অথচ তাঁর দাবি, অল্প সময় কাজ করা কয়েকজনকে নতুন নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের শ্রমের মূল্যায়ন এবং নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে কর্মী লিপি দাবি করেন, ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হলেও তাঁকে চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রম বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আন্দোলনকারীরা বলেন, টানা দুই দিন ধরে কর্মসূচি পালন করলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ও মানবিক ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচআরডির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ২৮ জনই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচআরডির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, জনবল সরবরাহের জন্য দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠান নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরাসরি কাউকে নিয়োগ দেওয়া বা কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সুযোগ নেই। তাই এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরাসরি কিছু করার সুযোগ ছিল না।
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের সেবামূলক কাজে যুক্ত থেকেও নতুন নিয়োগে বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে এখন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও ন্যায্য মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন এসব অস্থায়ী কর্মচারী। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের শ্রম ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দিয়ে মানবিক বিবেচনায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
এআইএল/সকালবেলা