টুইন টাওয়ার ট্র্যাজেডির আড়াই দশক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: একটি শান্ত সকাল, চারটি ছিনতাইকৃত যাত্রীবাহী বিমান এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমূল বদলে যাওয়া পুরো পৃথিবী। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর—আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে নিউইয়র্কের আকাশে ঘটেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বিভীষিকাময় ঘটনা।
সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি বিমান সরাসরি আঘাত হানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে। কোটি কোটি মানুষ যখন হতচকিত হয়ে টিভির পর্দায় তাকিয়ে, ঠিক তখনই চোখের পলকে দ্বিতীয় বিমানটি আছড়ে পড়ে দক্ষিণ টাওয়ারের ওপর। কিছুক্ষণের ব্যবধানে তৃতীয় বিমানটি আঘাত করে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে এবং চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের অসীম সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি উন্মুক্ত মাঠে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। সেই রক্তক্ষয়ী দিনে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়েছিল গগনচুম্বী টুইন টাওয়ার, প্রাণ হারিয়েছিলেন ২ হাজার ৯৭৭ জন নিরপরাধ মানুষ।
তবে ৯/১১-এর প্রভাব কেবল সেই দিনের প্রাণহানি বা ধ্বংসস্তূপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তী আড়াই দশক ধরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আধুনিক যুদ্ধকৌশল, ডিজিটাল প্রযুক্তি, গণমাধ্যম এবং নাগরিক নজরদারি ব্যবস্থার ওপর পড়েছে এর অপরিবর্তনীয় প্রভাব।
বিশ্ব যখন প্রথমবার একসঙ্গে দেখল লাইভ ট্র্যাজেডি ৯/১১ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ঘটেছিল, যখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ মাত্র ডানা মেলতে শুরু করেছে। এর ফলে নিউইয়র্কের লোমহর্ষক দৃশ্যগুলো কেবল আমেরিকানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বের প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে হামলার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় এটি সৃষ্টি করেছিল ‘গ্লোবাল সাইমালটেনিয়িটি’—অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শতকোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই অনুভূতির যৌথ প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে উঠেছিল।
পাল্টে যাওয়া সাংবাদিকতা ও সিটিজেন জার্নালিজম টুইন টাওয়ারের ধসের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার প্রচলিত সংজ্ঞাও বদলে যায়। পেশাদার ফটোসাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের ক্যামেরা ও মোবাইলে ছবি তুলতে শুরু করেন। মেমোরি কার্ডের বিকাশ ফিল্ম যুগের সমাপ্তি টেনে দ্রুত তথ্য পাঠানোর নতুন পথ তৈরি করে। ব্যক্তিগত ব্লগ ও প্রাথমিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, যা আজকের ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
শুরু হয় তথাকথিত ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হামলার পর বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে ওয়াশিংটনের সামরিক আগ্রাসনে। আল-কায়েদা ও তালেবানকে উৎখাতের নামে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে শুরু হয় সামরিক অভিযান। এরপর ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া অজুহাত তুলে আক্রমণ চালানো হয় ইরাকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই দীর্ঘ যুদ্ধে লাখ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অপচয় হয় এবং দিনশেষে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার প্রতি প্রাথমিক যে বৈশ্বিক সহানুভূতি ছিল, তা চরম ক্ষোভে রূপ নেয়।
নিরাপত্তার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিলোপ ৯/১১-এর পর বৈশ্বিক আকাশপথ ও সীমান্ত নিরাপত্তায় আসে আমূল কড়াকড়ি। তৎকালীন মার্কিন সরকারের ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’ এবং নতুন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাঠামোর অধীনে পাসপোর্ট, বিমানবন্দর, টেলিফোন কল ও ই-মেইলের ওপর রাষ্ট্রের সার্বক্ষণিক নজরদারি আইনগত বৈধতা পায়। সেই নজরদারির বিস্তার আজ ২০২৬ সালে এসে পৌঁছেছে ফেসিয়াল রিকগনিশন, হাইপার-সার্ভিল্যান্স ক্যামেরা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সর্বগ্রাসী অ্যালগরিদমে। এর ফলে আধুনিক নাগরিকরা প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হচ্ছেন—নিরাপত্তার মোড়কে আমরা কি আসলে একটি বিশাল নজরবন্দি উন্মুক্ত কারাগারে বাস করছি?
প্রযুক্তির আলো ও অন্ধকারের দ্বন্দ্ব ৯/১১-পরবর্তী দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যে বিকাশ ঘটেছিল, তা ২০১০ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর মতো জনআন্দোলনগুলোকে সংগঠিত করতে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সেই একই প্রযুক্তি আজ কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর হাতে আন্দোলনকারীদের ট্র্যাক করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মুক্ত তথ্যের মাধ্যমগুলো আজ অপপ্রচার ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারখানায় রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট: সত্য ও অসত্যের সীমারেখা ২০০১ সালে একটি ছবি বা ভিডিও দেখলে মানুষ নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করত তা বাস্তব। কিন্তু হামলার ২৫ বছর পর ২০২৬ সালের প্রযুক্তি বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। জেনারেটিভ এআই এবং ডিপফেকের যুগে একটি বাস্তব ভিডিওকে মুহূর্তেই মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যায়, আবার ভুয়া ঘটনাকে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় নিমিষেই। ৯/১১ মানবজাতিকে এমন এক যুগে নিয়ে এসেছে, যেখানে মানুষ পরস্পরের সাথে আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি যুক্ত, কিন্তু তথ্যের দিক থেকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভ্রান্ত।
তাই আজ ৯/১১-এর রজতজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসবিদদের বড় পর্যবেক্ষণ হলো—এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’ বা ঐতিহাসিক বিভাজনরেখা; যার আগের বিশ্ব আর পরের বিশ্ব কখনো এক হতে পারেনি। আজ বড় প্রশ্ন এটি নয় যে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল; বরং সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হলো—হামলা-পরবর্তী আড়াই দশকে আমরা যে বিশ্ব তৈরি করেছি, তা কি মানবজাতির জন্য সত্যিই আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ ও মানবিক হতে পেরেছে? নাকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা স্রেফ ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছি?