কয়লা উৎপাদন বাড়ানোর জোরালো পথে ভারত: বিশ্বজুড়ে কেন নতুন উদ্বেগের মেঘ?
অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় যখন জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লার ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, ঠিক সেই বিপরীত স্রোতে হেঁটে ভারতে নতুন কয়লাখনির প্রস্তাব ও উৎপাদন বাড়ানোর তোড়জোড় তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা 'গ্লোবাল এনার্জি মনিটর'-এর সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন কয়লা সরবরাহের প্রস্তাবনায় ভারতের অবস্থানই এখন সবচেয়ে এগিয়ে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে, গত বছর বিশ্বব্যাপী নতুন যেসব কয়লাখনি প্রকল্পের প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা থেকে বছরে অতিরিক্ত অন্তত ২৫০ কোটি টন কয়লা উত্তোলন সম্ভব, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সার্বিকভাবে নতুন খনি চালুর গতি কিছুটা ধীর হলেও কেবল ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কারণেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সূচক ওপরের দিকে অবস্থান করছে।
ভারতের এই নতুন খনি প্রসারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম তাপদাহ ও অভ্যন্তরীণ তীব্র গরমের ফলে দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল চাহিদা পূরণ এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে ভারতের কয়লা মন্ত্রণালয় উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত তাদের কয়লা উত্তোলন মোট ১১৫ কোটি টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১০ কোটি টন বেশি।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছিল যে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে কয়লার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। গ্লোবাল এনার্জি মনিটর সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব বাজারের এই সার্বিক মন্থরগতির সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে ভারতের কয়লা খাতের এই আগ্রাসী সম্প্রসারণ।
তবে চিত্রটি পুরোপুরি একপেশে নয়। আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক 'এমবার'-এর অন্য একটি গবেষণা রিপোর্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বায়ু ও সৌরশক্তির ব্যবহার প্রথমবারের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে পেছনে ফেলে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, চীনে ও ভারতে রেকর্ড পরিমাণ সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা সত্ত্বেও, বর্ধিত বিদ্যুতের আকস্মিক ঘাটতি মেটাতে ভারত এখনো নতুন কয়লা প্রকল্পের ওপরই ভরসা রাখছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কয়লাখনি তৈরি ও পরিচালনা করা অর্থনৈতিকভাবে দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য শক্তি যেভাবে দ্রুত কয়লার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে কয়লাভিত্তিক অবকাঠামোতে নতুন বিনিয়োগ অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই নির্মাণ কাজ শুরুর আগেই এসব প্রস্তাবিত কয়লাখনি বাতিল করে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সুরক্ষার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
|