সেন্টমার্টিনে ৪ হাজার কুকুরের রাজত্ব, খাদ্যসংকট রুখছে স্বেচ্ছাসেবীরা

প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ণ
সেন্টমার্টিনে ৪ হাজার কুকুরের রাজত্ব, খাদ্যসংকট রুখছে স্বেচ্ছাসেবীরা
সেন্টমার্টিন সৈকতে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভবঘুরে কুকুরের দল। (ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া)

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারের পর্যটন ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন যেন এখন ৪ হাজার কুকুরের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাত্র আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ছোট্ট দ্বীপে বর্তমানে প্রায় চার হাজারেরও বেশি ভবঘুরে কুকুরের বসবাস। পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট খাবারে এসব প্রাণীর দিন ভালোভাবে কাটলেও, মৌসুম শেষে পর্যটক চলে যাওয়ার পর দ্বীপজুড়ে দেখা দেয় তীব্র খাদ্যসংকট। অতীতে এমন ভয়াবহ সংকটে পড়ে আড়াই হাজারের বেশি কুকুর মারা গিয়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে বর্তমানে কিছু মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নানামুখী উদ্যোগে নিয়মিত খাবার পেয়ে কোনোমতে টিকে আছে এই হাজারো ক্ষুধার্ত প্রাণী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনের শত শত হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ফেলে দেওয়া খাবারই ছিল এই ভবঘুরে কুকুরগুলোর প্রধান খাদ্য। কিন্তু অফ-সিজন বা পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খাবারের সেই বড় উৎসটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেক কুকুর দিনের পর দিন কোনো খাবার না পেয়ে মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এ সময় খাবারের সন্ধানে কুকুরগুলো সৈকত ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাতও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে। অতীতে এই খাদ্যসংকট এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে, সে সময় আড়াই হাজারের বেশি কুকুর অনাহারে মারা যায়। এমনকি বেঁচে থাকার তাগিদে কিছু কুকুর মৃত কুকুরের দেহ পর্যন্ত খেয়েছে বলে দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তীব্র ক্ষুধার্ত থাকার কারণে সে সময় স্থানীয় শিশুদের কামড়ে আহত করার ঘটনাও ঘটেছিল। এছাড়া জেলেরা মাছ ধরতে গেলে প্রায়ই কুকুরের উপদ্রবে পড়তেন এবং সৈকতে সাধারণ মানুষের চলাচলও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০২২ সালে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৬টি কুকুর দ্বীপের বাইরে মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তরের একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের তীব্র আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশবাদীদের বাধায় স্থানান্তর বন্ধ হওয়ার পর থেকে দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে আরও বেড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এমন চরম সংকটময় অবস্থায় সেন্টমার্টিনের ক্ষুধার্ত কুকুরগুলোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ‘ফাইন্ডিং হোপ’ নামের একটি মানবিক সংগঠন। এই সংগঠনটির অর্থায়নে বর্তমানে স্থানীয় চারজন স্বেচ্ছাসেবী প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পরপর দ্বীপের প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার কুকুরকে নিয়মিত খাবার দিচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, প্রতিবার প্রায় সাড়ে পাঁচ বস্তা চাল, ডিম, সবজি, তেল ও প্রয়োজনীয় মসলা দিয়ে বড় বড় পাতিলে পুষ্টিকর খিচুড়ি রান্না করা হয়। এরপর সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিভিন্ন নির্ধারিত পয়েন্টে নিয়ে সেই খাবার বিতরণ করা হয়, যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক কুকুর এই খাবার খেতে পারে। তারা আরও জানান, নিয়মিত এই খাবার সরবরাহ শুরু হওয়ার পর থেকে দ্বীপে মানুষের ওপর কুকুরের আক্রমণের ঘটনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মূলত এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু খাদ্যসংকটে থাকা নিরীহ প্রাণীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই নয়, বরং একই সঙ্গে দ্বীপের মানুষ ও কুকুরের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত কমিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা।

মন্তব্য করুন