ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি প্রকাশ্যে, থানার নতুন ভবনের ঠিকাদারও তিনি!
বদরুদ্দোজা প্রধান, পঞ্চগড় প্রতিনিধি: হত্যাচেষ্টা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) আসামি হয়েও পঞ্চগড় সদর থানার নতুন ত্রিতল ভবন নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রকাশ্যে পরিচালনা করছেন আব্দুল হান্নান শেখ নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। উচ্চ আদালতের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ না করলেও, তিনি নিয়মিত থানা প্রাঙ্গণেই সরকারি প্রকল্পের কাজ তদারকি করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। থানার ভেতরেই ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির এমন অবাধ যাতায়াত ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আব্দুল হান্নান শেখ পঞ্চগড় শহরের বাসিন্দা ও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-ঠিকাদার। এ ছাড়া তিনি পঞ্চগড় জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় সদর থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত হান্নান শেখ গত ৪ মে উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) থেকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন পান। আদালত তাঁকে সুনির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে পঞ্চগড়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিনের আবেদন করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করা এবং মামলার সাক্ষীদের কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা প্রভাবিত না করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
উচ্চ আদালতের ওই আদেশের অনুলিপি গত ৩ জুন পঞ্চগড়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৌঁছায়। তবে সংশ্লিষ্ট আইনগত সূত্রের দাবি, আগাম জামিনের নির্ধারিত মেয়াদ গত জুনের মাঝামাঝিতে শেষ হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বর্তমানে পূর্ণ কার্যকর রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো হান্নান শেখ কোনো লুকোছাপা না করে প্রকাশ্যে চলাফেরা ও ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি বর্তমানে খোদ পঞ্চগড় সদর থানার নির্মাণাধীন নতুন ভবনের ঠিকাদার হিসেবে নিয়মিত থানা চত্বরে এসে কাজ তদারকি করছেন। অথচ নাকের ডগায় এমন একজন চিহ্নিত আসামি ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করছে না। এই ঘটনায় পুলিশের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন প্রয়োগের সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
মামলার বাদী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "উচ্চ আদালত শর্তসাপেক্ষে তাঁকে আগাম জামিন দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ করেননি। এরপরও তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং পুলিশের চোখের সামনেই সরকারি কাজ করছেন। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হওয়া উচিত, কিন্তু এখানে আমরা চরম বৈষম্য দেখছি।"
এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চগড় আদালতের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, "আগাম জামিন কোনো স্থায়ী জামিন নয়। উচ্চ আদালতের দেওয়া নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তা না করলে উচ্চ আদালতের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাঁকে গ্রেপ্তারে কোনো আইনি বাধা থাকে না।"
বিস্ময়করভাবে, নিজের জামিন না থাকার বিষয়টি এক প্রকার স্বীকার করে অভিযুক্ত আব্দুল হান্নান শেখ বলেন, "আমি এখনো জামিন হইনি। আমি বিনা জামিনে রয়েছি। জামিন হলে সেখানে স্বাক্ষর দিতে হয়। আমি কোনো স্বাক্ষর দেইনি।"
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, "বিষয়টি উচ্চ আদালতের আদেশের কাগজপত্র এবং নথিপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।"
তবে খোদ থানা ভবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণকাজে একজন পলাতক আসামির সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং পুলিশ প্রশাসনের এই রহস্যজনক 'দেখেও না দেখার ভান' করার প্রবণতায় পুরো জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এআইএল/সকালবেলা
|