নিজ হাতে পূর্ণ কুরআন লিখে অনন্য দৃষ্টান্ত কুমিল্লার সুরাইয়ার
বিশেষ প্রতিনিধি: নিজের মেধা, ধৈর্য আর গভীর ধর্মপ্রাণতাকে পুঁজি করে নিজ হাতে সম্পূর্ণ ৩০ পারা পবিত্র কুরআন লিখে এক অনন্য ও প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার শিক্ষার্থী সুরাইয়া জান্নাত। তাঁর হাতে লেখা কুরআনের ক্যালিগ্রাফি ও হরফগুলো এতটাই নিখুঁত যে, প্রথম দেখায় এটি ছাপানো নাকি হাতে লেখা তা আলাদা করা কঠিন।
১৮ বছর বয়সী সুরাইয়া জান্নাত লাকসাম উপজেলার মুদাফরগঞ্জ এ ইউ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের চাঁদগাঁও গ্রামের সৌদি প্রবাসী নুর হোসেন লিটন ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির কন্যা।
সুরাইয়ার এই অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে লাকসাম উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সুরাইয়াকে উৎসাহিত করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক রাশেদা আক্তার, লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা এবং কান্দিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুর ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
লাকসামের ইউএনও নার্গিস সুলতানা সুরাইয়ার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "এত অল্প বয়সে নিজ হাতে পুরো কুরআন লিখে সুরাইয়া আমাদের লাকসাম তথা পুরো দেশের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তার হাতের লেখা অত্যন্ত চমৎকার। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি এবং তার পড়াশোনার যেকোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।"
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি পবিত্র কুরআন নিজ হাতে লেখার এই পুণ্যময় কাজ শুরু করেন সুরাইয়া। মাদ্রাসার নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও পড়াশোনার ফাঁকে প্রতিদিন নিয়ম করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি কুরআনের আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ করতেন। টানা ৮ মাসের অবিরাম প্রচেষ্টায় তিনি ৬১১ পৃষ্ঠার পুরো কুরআন লেখা সম্পন্ন করেন। এই মহৎ কাজে তাঁর প্রায় ৫৫টি কলম ব্যবহার করতে হয়েছে।
সুরাইয়া জান্নাত তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "মূলত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং শেষ বিচারের দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত লাভের আশায় আমি এই উদ্যোগ নিই। প্রতিবার লেখার বসার আগে আমি পবিত্র হয়ে অজু করে নিতাম এবং দরূদ শরীফ পাঠ করে লেখা শুরু করতাম।"
তিনি আরও বলেন, "সমবয়সী অন্যদের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক-ইউটিউব) সময় নষ্ট না করে আমি কল্যাণকর কিছু করতে চেয়েছি। সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে কষ্ট করে কুরআন সংরক্ষণ করেছিলেন, সেই ইতিহাস থেকেই আমি মূলত অনুপ্রেরণা পেয়েছি।"
সুরাইয়া জানান, পুরো কুরআন লেখার পেছনে তাঁকে সবচেয়ে বেশি মানসিক শক্তি ও উৎসাহ দিয়েছে তাঁর ছোট ভাই নাহিদ হাসান, যে আবেদনগর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সুরাইয়া তাঁর আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস গ্রন্থ ‘সহিহ বুখারি’ও নিজ হাতে লেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। এই জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
মেয়ের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে গর্বিত সুরাইয়ার মা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের আরবি ভাষা ও সুন্দর হাতের লেখার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। মেয়ের এই ব্যতিক্রমী ও পুণ্যময় সাফল্যে আনন্দিত হয়ে তাঁর প্রবাসী বাবা নুর হোসেন লিটন সুরাইয়াকে এক লাখ টাকা নগদ পুরস্কার দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন।
এআইএল/সকালবেলা
|