অচল কক্সবাজার রাডার স্টেশন, সমুদ্রে জেলেদের উদ্বেগ

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ণ
অচল কক্সবাজার রাডার স্টেশন, সমুদ্রে জেলেদের উদ্বেগ

ইমতিয়াজ মাহমুদ ইমন, কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি 'কক্সবাজার রাডার স্টেশন' দীর্ঘ তিন বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট থেকে বন্ধ রয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার এই প্রযুক্তিগত 'চোখ'। ফলে বঙ্গোপসাগরে আকাশ ও সমুদ্র নজরদারিতে যেমন বড় সংকট তৈরি হয়েছে, তেমনি চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।

সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচুতে কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই রাডার স্টেশনটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই-১ (খ) শ্রেণীভুক্ত)।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে সুইডিশ শিশু কল্যাণ সংস্থা ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ সহযোগিতায় স্টেশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল জাপান সরকারের (জাইকা) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এটিকে আধুনিক 'ডপলার' প্রযুক্তিতে উন্নীত করা হয়।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, প্রায় ৯৯ ফুট উঁচু ভবনের ওপর স্থাপিত এই ডপলার রাডারটি ৪৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত সুদূর বিস্তৃত এলাকার আবহাওয়ার গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারত। এখান থেকে সংগৃহীত মেঘের গঠন, বৃষ্টির তীব্রতা, বজ্রঝড় বা আকস্মিক দমকা হাওয়ার তথ্য ভি-স্যাট (VSAT) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো, যা দ্রুত আগাম সতর্কবার্তা জারিতে সাহায্য করত।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের আগস্টে যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হলে রাডারটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এরপর কারিগরি সহায়তাদাতা জাপানি সংস্থা 'জাইকা'-কে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হলে, সরকারি নিজস্ব অর্থায়নে নতুন যন্ত্রপাতি কিনে রাডারটি সচল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না মেলায় গত তিন বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে ২৩ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরা জেলে মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, "আমরা জাল ফেলতে সাগরের ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার গভীরে চলে যাই। সেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না, রেডিওর মাধ্যমে আবহাওয়ার খবরই আমাদের একমাত্র ভরসা। রাডার বন্ধ থাকায় হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেলে আমরা আগেভাগে জানতে পারি না। বুক ভরা আতঙ্ক নিয়ে সাগরে ভাসতে হয়।"

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটাপন্ন সময়ে যেখানে দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা, সেখানে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার বছরের পর বছর অচল থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি উপকূলের লাখো মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।"

শুধু সমুদ্র নয়, রাডারটি অচল থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে বিমান চলাচলও। কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক গোলাম মুর্তজা হোসেন জানান, বৈরী আবহাওয়ায় রানওয়েতে বিমান ওঠানামার জন্য আবহাওয়া অফিসের নিখুঁত রিপোর্টের ওপর পাইলটদের নির্ভর করতে হয়। রাডারটি সচল থাকলে অনেক দ্রুত ও নির্ভুল লোকাল ডেটা পাওয়া সম্ভব হতো।

রাডারটি অচল থাকায় স্টেশনটি বর্তমানে নামেমাত্র টিকে রয়েছে। স্টেশনটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ১৮টি অনুমোদিত পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন কর্মী। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন ৪ জন পুলিশ সদস্য। স্টেশনের নিরাপত্তা ইনচার্জ কমল কান্তি পাল জানান, রাডার সচল না থাকায় কোনো প্রযুক্তিগত কাজ হচ্ছে না, কেবল দৈনন্দিন অফিশিয়াল ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম চলছে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন