মিকেল ওইয়ারসাবাল: স্প্যানিশ ফুটবলের নিঃশব্দ ও নির্ভরযোগ্য জাদুকর

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ণ
মিকেল ওইয়ারসাবাল: স্প্যানিশ ফুটবলের নিঃশব্দ ও নির্ভরযোগ্য জাদুকর

নিজস্ব প্রতিবেদক:ফুটবলের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে কেউ আলো কাড়েন বিস্ফোরক গতিতে, কেউ অনবদ্য ও জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে, কেউ আবার দূরপাল্লার জোরালো শটে গ্যালারিকে উন্মাদ করে তোলেন। তবে এমন কিছু বিরল প্রজাতির ফুটবলারও আছেন, যাঁরা মাঠে কোনো বাড়তি হইচই না করে ম্যাচের পুরো ছন্দ বদলে দেন এবং দলের প্রয়োজনে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেন। স্প্যানিশ তারকা মিকেল ওইয়ারসাবাল হলেন সেই ঘরানার একজন নিখুঁত ফুটবল শিল্পী এবং স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন প্রজন্মের অন্যতম প্রধান নির্ভরতার নাম।

১৯৯৭ সালের ২১ এপ্রিল স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের ছোট্ট শহর আইবারে জন্মগ্রহণ করেন মিকেল ওইয়ারসাবাল উগার্তে। এক মধ্যবিত্ত, পরিশ্রমী এবং পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা ওরিয়ারসাবালের বাবা আর্নেস্তো ওইয়ারসাবাল ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা যুক্ত ছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে। মা-বাবার অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা এবং খেলাধুলা—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি।

শৈশবেই স্থানীয় ক্লাব এইবারের বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময় তাঁর প্রতিভার প্রথম ঝলক দেখা যায়। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন স্পেনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল সোসিয়েদাদের যুব একাডেমিতে। সেখানে নিজেকে দারুণভাবে প্রমাণ করার পর ২০১৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রিয়াল সোসিয়েদাদের মূল দলে অভিষেক হয় ওইয়ারসাবালের। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের বহুমুখী প্রতিভার জোরে ক্লাবের নিয়মিত একাদশে জায়গা পাকা করেন তিনি। বাম প্রান্তের ফরোয়ার্ড, সেন্টার ফরোয়ার্ড কিংবা আক্রমণভাগের যেকোনো পজিশনে সমান দক্ষতায় খেলতে পারেন এই স্প্যানিশ তারকা। বাম পায়ের নিখুঁত শট, ঠান্ডা মাথায় পেনাল্টি নেওয়ার অসামান্য দক্ষতা, সতীর্থদের সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়া এবং চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাই তাঁকে স্পেনের অন্যতম কার্যকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

আজকের দলবদলের বাজারে যেখানে তারকারা প্রতিনিয়ত ক্লাব পরিবর্তন করছেন, সেখানে রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে শত শত ম্যাচ খেলা এবং দীর্ঘদিন একই ক্লাবের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে নেতৃত্ব দেওয়াটা ফুটবল বিশ্বে এক বিরল ঘটনা। ২০২০ সালে রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে কোপা দেল রে জয়ের ঐতিহাসিক স্মৃতি তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায়, যেখানে বহু বছরের শিরোপা খরা কাটানো বাস্ক অঞ্চলের ক্লাবটির সাফল্যের মূল নায়ক ও অধিনায়ক ছিলেন এই ওইয়ারসাবাল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তাঁর সাফল্যের খাতা বেশ ভারী। স্পেনের অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে স্পেনের রুপা জয় এবং পরবর্তীতে উয়েফা নেশনস লিগ জয়েও তিনি পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। ফাইনালের চরম চাপ ও কোটি মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার মাঝেও অত্যন্ত শান্ত থেকে স্পেনের হয়ে ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলটি করে দলকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা এনে দেন ওইয়ারসাবাল। সেই এক গোলই তাঁকে স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমর করে দিয়েছে।

তবে ওইয়ারসাবালের এই বর্ণিল ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কাও এসেছিল। হাঁটুর গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি চোটে পড়ে দীর্ঘ সময় তাঁকে মাঠের বাইরে ছিটকে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমে চোটকে হারিয়ে তিনি আবারও ফিরে আসেন রাজার বেশে। চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও স্পেনের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান নির্ভরতার নাম মিকেল ওইয়ারসাবাল। গ্রুপ পর্বে তিনি শুধু গোল করেই থেমে থাকেননি; দলের আক্রমণ সাজানো এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার কঠিন দায়িত্বও পালন করেছেন সমানতালে। শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও তিনি ছিলেন স্পেনের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়দের একজন। আক্রমণে তাঁর অবিরাম দৌড়, বল ছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যূহ ভাঙার মরিয়া চেষ্টা স্পেনকে ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছিল।

স্পেন দলে বর্তমানে লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি কিংবা দানি ওলমোর মতো বিশ্বকাঁপানো একঝাঁক তরুণ তারকার ভিড়েও ওইয়ারসাবালের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি কখনও নিজে গোল করেন, কখনও সতীর্থদের দিয়ে গোল করান, আবার কখনও নিজের পজিশন ছেড়ে সতীর্থদের শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেন। আধুনিক ফুটবলের ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুগে এমন নিঃস্বার্থ ফরোয়ার্ড সত্যিই মেলা ভার। মাঠের বাইরেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও নিভৃত জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন; প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফুটবলের পাশাপাশি শিক্ষার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে, ইতিমধ্যেই তিনি ব্যবসা প্রশাসন (BBA) বিষয়ে নিজের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করেও এমন বিনয় ধরে রাখার মানসিকতাই তাঁকে আর দশজন ফুটবলার থেকে আলাদা করেছে।

স্প্যানিশ ফুটবল আজ যে নতুন ও সোনালী এক যুগে প্রবেশ করছে, সেই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত মুখ মিকেল ওইয়ারসাবাল। তিনি হয়তো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত গ্ল্যামারাস সুপারস্টার বা সবচেয়ে দামী ফুটবলার নন; তবে প্রয়োজনের সময় যিনি দলের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হয়ে ওঠেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁকেই মনে রাখে। হয়তো কালের নিয়মে একদিন তাঁর ক্যারিয়ারের সব পরিসংখ্যান মানুষ ভুলে যাবে, কিন্তু রিয়াল সোসিয়েদাদের প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা, স্পেনের জার্সিতে তাঁর নিঃস্বার্থ লড়াই আর চোটের অন্ধকারকে হারিয়ে ফিরে আসার গল্প ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। মিকেল ওইয়ারসাবাল এভাবেই ফুটবল মাঠে নিঃশব্দে নিজের ইতিহাস লিখে চলেছেন।

মন্তব্য করুন