বেতাগীতে ইবতেদায়ি মাদ্রাসার বই ও বেতনে চরম অসঙ্গতি, তদন্তে প্রশাসন

প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৭ অপরাহ্ণ
বেতাগীতে ইবতেদায়ি মাদ্রাসার বই ও বেতনে চরম অসঙ্গতি, তদন্তে প্রশাসন

মোঃ সোহেল রানা, বরগুনা: উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলায় ৪৮টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে সরকারি অনুদান ও অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছে চারটি প্রতিষ্ঠান। সরকারি নথিতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে পাঁচজন করে শিক্ষক বেতন-ভাতার আওতায় রয়েছেন। একই নথিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ৩০ জন করে শিক্ষার্থী দেখিয়ে বই বিতরণের তথ্যও রয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, চার প্রতিষ্ঠানে নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০ জন। কিন্তু সরেজমিনে অনুসন্ধানে চার প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া যায়নি। তিনটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি মেলেনি। আরেকটিতে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পর দুই শিক্ষিকাকে আসতে দেখা যায়।

শ্রেণিকক্ষের ধুলাবালিতে ঢাকা বেঞ্চ, অপরিচ্ছন্ন আসবাবপত্র, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীশূন্য পরিবেশ—সব মিলিয়ে সরকারি নথির সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অমিলের প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেতাগীর ৪৮টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান ওই দপ্তরের মাধ্যমে অনুদান পায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—করুণা হাসানিয়া দারুল উলুম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, পূর্ব আয়লা চান্দখালী হাজেরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, উত্তর কাউনিয়া ছালেহিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং জলিশারহাট দলিল উদ্দিন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।

নথি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন করে শিক্ষক বেতন-ভাতার আওতায় রয়েছেন। আবার প্রতিটি মাদ্রাসার ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বই বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী চার প্রতিষ্ঠানে ২০ জন শিক্ষক এবং ১২০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

অনুসন্ধানের প্রথম গন্তব্য ছিল হোসনাবাদ ইউনিয়নের জলিশারহাট দলিল উদ্দিন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। সরেজমিনে গিয়ে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ও টেবিল-চেয়ারে জমে থাকা ধুলাবালি এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে নিয়মিত পাঠদান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসায় শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। স্থানীয়দের দাবি, গত ছয় মাসেও তারা কোনো শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসায় এসে ক্লাস করতে দেখেননি। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল কালামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে মাদ্রাসার শিক্ষক খোকন সিকদারের সঙ্গে কথা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ সংগ্রহের সময় তিনি উপজেলার কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতার পরিচয় দিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন।

এরপর অনুসন্ধানী দল যায় করুণা হাসানিয়া দারুল উলুম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায়। সেখানেও সরেজমিনে কোনো শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ও অন্যান্য আসবাবপত্র ধুলাবালিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরিদর্শনের সময় কোনো শিক্ষকও উপস্থিত ছিলেন না। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে পরে দুই শিক্ষিকাকে মাদ্রাসায় আসতে দেখা যায়। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মাদ্রাসার একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন না এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে না।

অনুসন্ধানের তৃতীয় প্রতিষ্ঠান উত্তর কাউনিয়া ছালেহিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রধান শিক্ষক মো. মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ও মাদ্রাসার সব শিক্ষক মাদ্রাসার একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে ঢাকায় গেছেন।

তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বক্তব্যের সঙ্গে তার এই দাবিরও অমিল পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষককে ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও এলাকায় দেখা গেছে। এখানেই শেষ নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার জন্য দান করা জমিতে থাকা গাছ বিক্রি করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ওই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে—তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসাটির জন্য প্রায় ২৮০ শতাংশ জমি দান করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এত জমি থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় মাদ্রাসায় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। তাদের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত বন্ধ।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠছে সরকারি নথির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যা নিয়ে। চারটি প্রতিষ্ঠানে ১২০ জন শিক্ষার্থী এবং ২০ জন শিক্ষক সরকারি নথিতে বেতন ও শিক্ষা-সুবিধার আওতায় থাকলেও সরেজমিনে সেই অনুপাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩০ জন শিক্ষার্থীর বই বিতরণের তথ্যও রয়েছে। কিন্তু যে শ্রেণিকক্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থীর পাঠ নেওয়ার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ধুলাবালিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে বেঞ্চ ও টেবিল।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—নথিতে থাকা ১২০ শিক্ষার্থী কি বাস্তবে নিয়মিত পড়াশোনা করছে? পাঁচজন করে শিক্ষক বাস্তবে কতদিন মাদ্রাসায় উপস্থিত থাকেন? বইগুলো কারা পেয়েছে? আর সরকারি অনুদান ও বেতন-ভাতার বিপরীতে শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন। তিনি জানান, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন