রাশিয়াকে পরমাণু ও রাসায়নিক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে চীন

প্রকাশ: বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ণ
রাশিয়াকে পরমাণু ও রাসায়নিক যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার এক গোপন সামরিক আঁতাত। গত বছর রুশ বাহিনীর জন্য চীনের মাটিতে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ব্যক্তিগতভাবে অনুমোদন করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসভ।

এই গোপন কার্যক্রমে দুই দেশের অন্তত চারজন শীর্ষ সামরিক জেনারেল সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন ইউরোপের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন এই ধরনের স্পর্শকাতর প্রশিক্ষণে এত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে, রাশিয়া ও চীন এই দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে, যদিও বেইজিং ও মস্কো যথারীতি এই ধরনের কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

রয়টার্সের হাতে আসা রাশিয়ার একটি গোপন সামরিক নথি থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসভের জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই মিশন শুরু হয়। নির্দেশনানুযায়ী, রুশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীনের ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) বিভিন্ন গোপন স্থাপনায় বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চীন সফর করে।

তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জৈবিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণ

ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে বেইজিংয়ের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনায় তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জৈবিক (CBRN) সুরক্ষা বিষয়ে তিন সপ্তাহের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রুশ সেনারা চীনা প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধকৌশলের পাঠ নেন, একটি মডেল পারমাণবিক চুল্লি পরিদর্শন করেন এবং রাসায়নিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণ ও পারমাণবিক দূষণের মধ্যে বায়ু চলাচল ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার জটিল কৌশল রপ্ত করেন।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন, তেজস্ক্রিয়, জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকায় এই সামরিক বিনিময়ের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এই ধরনের প্রশিক্ষণ যেকোনো দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন বিষয় হিসেবে গণ্য হয়।

এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকট নিয়ে তাদের পূর্বের নিরপেক্ষ অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’। বেইজিং বরাবরই দাবি করে আসছে, ইউক্রেন যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি, বরং শান্তি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।

এর আগে গত মাসেও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে জানা গিয়েছিল, চীন প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ পরে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস ১৫ জুন স্পষ্ট করে বলেন, ব্রাসেলস নিজস্ব বিশ্বস্ত সূত্রে এই প্রশিক্ষণের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং এখন এর বৈশ্বিক প্রভাব মূল্যায়ন করছে। বেইজিং অবশ্য কাজা কালাসের এই মন্তব্যকে ‘নিরেট অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ক্রেমলিন এই নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ওপর ‘ভুল তথ্য’ প্রচারের দায় চাপিয়েছে।

চীন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন সমীকরণ

২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। একই সঙ্গে তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে মস্কোর এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

২৭ সদস্যের এই ইউরোপীয় জোটে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেও এই সামরিক প্রশিক্ষণের প্রতিক্রিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কি না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগে কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, "ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত চীনকে শুধু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বন্ধ করা এবং রাশিয়ার যুদ্ধের ‘নির্ণায়ক সহায়ক’ হিসেবে বেইজিংয়ের এই বিপজ্জনক ভূমিকাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।"

গোপন সামরিক নথির তথ্য অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল ভিত্তি ছিল ২ জুলাই স্বাক্ষরিত একটি গোপন চুক্তি, যেখানে রাশিয়ার মেজর জেনারেল রুস্তাম খুসাইনভ এবং চীনের সিনিয়র কর্নেল সান দাইউন স্বাক্ষর করেছিলেন। যদিও রাশিয়ার পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান আন্দ্রেই কার্তাপোলভ এই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ দাবি করে বলেছেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর চীনের কাছ থেকে নতুন করে শেখার কিছু নেই।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় দুই দেশের পার্থক্য

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে রাশিয়া আধুনিক ও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত ও বিশাল সামরিক শক্তির অধিকারী হলেও চীন গত কয়েক দশক ধরে বড় কোনো প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেয়নি।

রয়টার্সের দেখা রুশ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এই প্রশিক্ষণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই উঠে এসেছে। চীনের নানজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিবেদনে চীনাদের উন্নত সরঞ্জাম, আধুনিক সিমুলেটরের ব্যবহার এবং প্রশিক্ষকদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রশংসা করা হলেও, একই সঙ্গে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অভাবের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার স্থলবাহিনীর উপপ্রধান কর্নেল জেনারেল রুস্তাম মুরাদভ এই রুশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে, চীনের পিএলএর তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জৈবিক প্রতিরক্ষা একাডেমির প্রধান মেজর জেনারেল লি জিনসুন এবং রুশ মেজর জেনারেল ভিটালি গেরাসিমভ বেনবুতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কোর্সে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

মন্তব্য করুন